বৃহস্পতিবার, ১৬ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১লা শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশে ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের নতুন ইভি বিপ্লবের প্রস্তুতি

বাংলাদেশ আজ একটি নতুন উজ্জ্বল ভোরের দিক menuju যাচ্ছে। পেট্রোলের ঝাঁঝালো গন্ধ, সীসা-মিশ্রিত কালো ধোঁয়া ও ইঞ্জিনের কানফাটা গর্জন এখন ইতিহাসের পাতায় স্থান নিচ্ছে। দেশের অটোমোবাইল শিল্পে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন হচ্ছে, যেখানে বিদ্যুৎচালিত যান (ইভি) বা ইলেকট্রিক মোবিলিটি আজ নতুন স্বপ্নের বাস্তবতা হয়ে উঠছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে শুল্কের বিধিনিষেধ তুলে দিয়ে সরকার যে ব্যাপক কর ও প্রণোদনার প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, তা দেশের অটোমোবাইল শিল্পের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। দেশীয় শীর্ষ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল ছোট করে আমদানি বন্ধ করে নয়, বরং নিজস্ব কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে প্রায় ৪,০০০ কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগের মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এই উদ্যোগগুলো দেশের পরিবেশ, অর্থনীতি ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এক বিপ্লবের সূচনাকে চিহ্নিত করছে। তবে, এই স্বপ্নময় পথে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। যেমন, গ্রিডের দুর্বলতা, বিদ্যুতের অপ্রতুলতা, চার্জিং স্টেশনের দীর্ঘমেয়াদি লোকসান ও লাভজনকতার অনিশ্চয়তা। বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা 世界সেরা ব্র্যান্ডের মতোই দেশেই উচ্চমাধ্যমিক মানের ইভি উৎপাদনে এগিয়ে আসছেন। এর মধ্যে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে দেশের বৃহত্তম ইভি কারখানা নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে কোম্পানি ব্যাটারি থেকে চ্যাসিস, বডি পর্যন্ত সবকিছুই স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করবে। প্রথমে উৎপাদিত গাড়িগুলো একবার সম্পূর্ণ চার্জ দিলে ৪৫০ কিলোমিটারের বেশি পথ চলতে পারবে, আর আল্ট্রা-ফাস্ট চার্জিং প্রযুক্তির মাধ্যমে মাত্র ৩০ মিনিটে ৮০ শতাংশ চার্জ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। রানার অটোমোবাইলস এবং বিওয়াইডি যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশের রাস্তায় ১,০০০ এর বেশি প্রিমিয়াম ইভি বাজারে এনেছে, যার মাধ্যমে তারা ধাপে ধাপে ২৬০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে স্থানীয় উত্পাদন লাইন গড়ে তুলছে। দেশের অন্যান্য বড় ব্যবসায়িক সংস্থাগুলো যেমন- নাসির গ্রুপ ও আকিজ মোটরস ৫০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। আকিজ গ্রুপ সাশ্রয়ী ছোট ইভি ও লাইট কমার্শিয়াল ট্রাক উৎপাদনে মনোযোগী, যা দেশের ই-কমার্সে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম। ওয়ালটন ও প্রাণ-আরএফএল অপরিহার্যভাবে টু-হুইলার, ই-বাইক ও স্কুটার বাজারে বিনিয়োগ করেছেন, যেখানে মধ্যবিত্তর জন্য পরিবেশবান্ধব যানবাহনের সুবিধা নিশ্চিত হবে। লাক্সারি কার ব্র্যান্ড অডি বাংলাদেশ ও ‘এখন চার্জ’ দেশের প্রথম ও বৃহত্তম অ্যাকোসিস্টেমের অংশ হিসেবে একত্রে কাজ করছে, ইতোমধ্যে ১৫০টির বেশি হোম চার্জিং ইউনিট ও কয়েকটি হাই-স্পিড চার্জিং স্টেশন স্থাপন করেছে। তবে, এই ইভি বিপ্লবের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিদ্যুৎ সরবরাহের মান ও নিরবচ্ছিন্নতা। রানার অটোমোবাইলসের প্রধান হাফিজুর রহমান খান বলছেন, হোম চার্জিং তো সহজ, তবে হাইওয়ে শেল্ভ স্টেশনগুলো চালাতে প্রয়োজন বড় ট্রান্সফরমার ও ডেডিকেটেড সাবস্টেশন। বর্তমানে এসব স্থাপনের জন্য কয়েক কোটি টাকা ব্যয় হয়, যা বড় চ্যালেঞ্জ। সৌরউৎপাদিত বিদ্যুৎ বা সৌরশক্তির উপর নির্ভরতা বাড়ানো হচ্ছে এই সংকট মোকাবেলার জন্য। একদিকে জমাট বাঁধা গ্রিড, লোডশেডিং ও ফিচার সংকূল অবস্থার জন্য দ্রুত চার্জিং স্টেশন স্থাপন কঠিন; অন্যদিকে, সরকারের সক্রিয় উদ্যোগ দরকার যাতে দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন চার্জিং নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। গবেষণা ও বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন, ডেটাবেজের আধুনিকীকরণ ও নবায়নযোগ্য শক্তির সংযোজন এই পরিবর্তনের মূল চাবিকাঠি। ইভির অর্থনৈতিক সুবিধাগুলো মূলত প্রতি কিলোমিটারে ৭০ শতাংশ খরচ সাশ্রয় দেখাচ্ছে। একদা পেট্রোল চালিত যানবাহনের তুলনায় ইভি চালানো প্রায় ৭০ শতাংশ কম খরচে হয়। বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তরা এই সাশ্রয়ের দিকটা বুঝতে শুরু করেছেন। তবে, এই স্বপ্নের বাস্তবায়ন ও গ্রাহকের আস্থার জন্য সরকারি উদ্যোগ, অবকাঠামো, প্রযুক্তি মানোন্নয়ন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিশ্চিত করতে হবে। শুধু বললেই হবে না, কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়াই এই ইভি বিপ্লব সফল হবে না। যদি বাংলাদেশি সড়কগুলোয় দূষণমুক্ত, শব্দহীন ও দক্ষ যানবাহনের গল্প লেখা হয়, তাহলে তা হবে এক অসাধারণ ইতিহাসের শুরু।

পোস্টটি শেয়ার করুন