বৃহস্পতিবার, ২৩শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৮ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জাতিসংঘে সুপারিশ: বাংলাদেশ ও নেপালের এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি সময় বাড়াতে

জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক) বাংলাদেশ ও নেপালের জন্য এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশের) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি সময় বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। গত ২১ জুলাই নিউইয়র্কে ইকোসকের বৈঠকে সদস্যরাষ্ট্ররা সর্বসম্মতিক্রমে এ সুপারিশ গ্রহণ করেন।

ইকোসকের আলোচনা কালে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী দুই দেশের পক্ষে প্রস্তুতিকাল তিন বছর বাড়ানোর যৌক্তিকতা ও প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তার বক্তব্য ছিল, টেকসই ও স্থিতিশীলভাবে এলডিসি থেকে উত্তরণ নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত সময় থাকা প্রয়োজন।

জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশন বুধবার (২২ জুলাই) অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) পাঠানো একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানান। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এর আগে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) দুই দেশের আবেদন পর্যালোচনা করে সাধারণ পরিষদে বিষয়টি উপস্থাপনের সুপারিশ করেছিল। সেই সুপারিশের ভিত্তিতেই ইকোসক বিষয়টি সাধারণ পরিষদে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে সাধারণ পরিষদে — নির্ধারিত সময় হিসেবে বলা হয়েছে ২৪ নভেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ওই দিনই তাত্ত্বিকভাবে বাংলাদেশ ও নেপালের এলডিসি তালিকা থেকে উত্তরণ কার্যকর হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইকোসকের সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী সরকারের টেকসই উত্তরণের প্রতি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, সাধারণ পরিষদ প্রস্তুতিকাল বাড়ালে তা নীতিগত সংস্কার বাস্তবায়ন ও এলডিসি-উত্তর সময়ের জন্য দেশের প্রস্তুতি আরও মজবুত করবে।

প্রসঙ্গত, সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার জন্য আবেদন করেছে। সরকারের যুক্তি অনুযায়ী সময় বাড়ালে সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল করা, চলমান সংস্কার সংহত করা এবং স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি (এসটিএস) অনুসারে অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচি শেষ করার জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত সুযোগ পাওয়া যাবে। আবেদনপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মূলত পাঁচ বছরের প্রস্তুতি সময় দেশী ও আন্তর্জাতিক নানা সংকটে গুরুতরভাবে ব্যাহত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সংকটগুলোর মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে কোভিড‑১৯ মহামারির দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব, বৈশ্বিক অর্থনীতির ধীর পুনরুদ্ধার, রাশিয়া‑ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও খাদ্যবাজারে অস্থিরতা, বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার কড়াকড়ি, বাণিজ্য পুনরুদ্ধারে বিলম্ব, মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাড়তে থাকা অনিশ্চয়তা। দেশীয় সংকট হিসেবে তারা আর্থিক খাতে অনিয়ম, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ও রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার অনিশ্চয়তার কথা উল্লেখ করেছে।

এ এলডিসি‑বিষয়ক পটভূমি জানতে হবে: বাংলাদেশ ১৯৭৫ সালে এলডিসি তালিকায় আসে এবং এ অবস্থার কারণে বিভিন্ন রপ্তানি সুবিধাসহ নানা সহায়তা পেয়েছে। এলডিসি‑হিসাব নিকাশে সিডিপিই ত্রিবার্ষিক মূল্যায়ন করে থাকে। মূল্যায়নে মাথাপিছু আয় (জি.এন.আই.), মানবসম্পদ সূচক (এইচএআই) এবং অর্থনৈতিক ঝুঁকি সূচক (ইভিআই)—এই তিনটি সূচকের উপর নজর রাখা হয়। কোনো দেশকে উত্তরণের যোগ্য মেনে নেওয়ার জন্য তিনটি সূচকের মধ্যে অন্তত দুটি সূচকে পারফর্ম করা বা মাথাপিছু আয় নির্ধারিত সীমার দ্বিগুণ হওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ২০১৮ ও ২০২১ সালের ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নে তিনটি সূচকেই উত্তীর্ণ হওয়ায় ২০২৪ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণ সুপারিশ করা হয়েছিল। তবে কোভিড মহামারির প্রভাব ও অন্যান্য ব্যাঘাতে উত্তরণ প্রক্রিয়া পিছিয়ে যায়।

সমমনা উদাহরণও আছে—সলোমন দ্বীপপুঞ্জ ২০২৩ সালে গৃহযুদ্ধ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সময় বাড়ানোর আবেদন করে এবং সিডিপি তিন বছর সময় বাড়িয়ে দেয়। পাশাপাশি সুনামি ও ভূমিকম্পের কারণে মালদ্বীপ ও নেপালের উত্তরণ নির্ধারিত সময়ে সম্ভব হয়নি।

এখন পুরো বিষয়টি সাধারণ পরিষদে যাবে এবং সেখানেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ধারিত হবে। সন্তোষজনকভাবে অতিরিক্ত সময় পেলে দেশগুলোকে নীতিগত সংস্কারটি শক্তভাবে টেকসই করতে এবং নামে‑পরের সমন্বিত পরিকল্পনার দ্বারা এলডিসি‑উত্তর বাস্তবে ঢুকতে সহায়তা মিলবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

পোস্টটি শেয়ার করুন