ওয়াশিংটনভিত্তিক দুই প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক সংস্থা—আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক—দীর্ঘ বিরতির পর আনুষ্ঠানিকভাবে ভেনেজুয়েলার সঙ্গে কূটনৈতিক ও আর্থিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের ঘোষণা দিয়েছে। ২০১৯ সালের বিতর্কিত নির্বাচন ও এরপর সৃষ্টি হওয়া আন্তর্জাতিক অচলাবস্থার কারণে এই দুই প্রতিষ্ঠান ওই সময় থেকে কারাকাসের সঙ্গে সবরকম কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছিল; এবার সাত বছর পর সেই সম্পর্ক পুনরায় স্বাভাবিক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হল।
আইএমএফ-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা এক বিবৃতিতে জানান, সংস্থা এখন ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি কাজ শুরু করবে। তিনি বলেন, আইএমএফের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মতামতকে বিবেচনায় নিয়ে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং আশা প্রকাশ করেন যে নতুন এই সংযুক্তি ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আইএমএফের ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বব্যাংকও একই পথে জারী থাকার কথা জানায়; বিশ্বব্যাংক সর্বশেষ ২০০৫ সালে দেশটিকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছিল।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এ সিদ্ধান্তকে একজন কূটনৈতিক সূচক হিসেবে দেখা হচ্ছে এবং এটি মার্কিন প্রশাসনের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক কৌশলের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। কয়েক সপ্তাহ আগে মার্কিন প্রশাসন ডেলসি রদ্রিগেজের ওপর থেকে ব্যক্তিগত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়টি আলোচনার বিষয় ছিল। একই সঙ্গে বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে ভেনেজুয়েলার রাজনীতির গতিপ্রকৃতি নিয়ে নানা দাবি ও ব্যাখ্যা এসেছে; এই ধরনের কিছু রিপোর্ট বিরোধিতাও রয়েছে এবং সব তথ্য উন্মোচিত বা নিরপেক্ষভাবে যাচাইযোগ্য নয়।
ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ এই পদক্ষেপকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি এটিকে ভেনেজুয়েলার জন্য একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে গ্রহণযোগ্যতা ফিরে পাওয়ার একটি প্রমাণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এখন দেশটি বৈশ্বিক ঋণদাতাদের কাছে পুনরায় আর্থিক সহায়তা ও কারিগরি সহায়তা চাওয়ার আনুষ্ঠানিক সুযোগ পাচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, ভেনেজুয়েলার সংকটাবস্থায় আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। দেশটির বৈদেশিক দেনার পরিমাণ প্রায় ১৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি বা তার বেশি হওয়ার অনুমান রয়েছে এবং তীব্র মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনৈতিক সংকটকে মোকাবিলা করতে আন্তর্জাতিক সহায়তা দরকার। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের কন্ডিশনাল সমর্থন এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠন সংক্রান্ত পরামর্শ দেশটিকে সংবিধানগত, আর্থিক ও নীতিগত সংস্কারের পথে পরিচালিত করতে পারে।
তবে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনটি রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিতও বটে। কিছু সমালোচক বলছেন, এটি ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্বকে নতুন করে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিচ্ছে, আবার অনেকে বলছেন যে সাধারণ মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নই মূল বিবেচ্য বিষয় হওয়া উচিত। ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষের মধ্যে এ সিদ্ধান্তকে একদিকে আশার আলো হিসেবে দেখা হচ্ছে, অন্যদিকে অনেকেই সতর্ক যে আন্তর্জাতিক সহায়তা কবে ও কীভাবে বাস্তব ফল বয়ে আনবে।
এখন দেখার বিষয়, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সহায়তা ও তদারকি ভেনেজুয়েলার ভাঙাচোরা অর্থনীতি কতটা দ্রুত ও স্থায়ীভাবে পুনরুদ্ধার করতে পারে। আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো কী ধরনের শর্ত আরোপ করবে, এবং গৃহীত নীতিগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে—এসবই আগামী দু’এক বছরের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠবে।