মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাবে এশিয়ার চাল বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। চলতি সপ্তাহে বিভিন্ন বাজার পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট হয়েছে যে অঞ্চলভিত্তিক চাহিদা-সরবরাহের ওঠানামা ও পরিবহন ব্যয়ের দুর্বলতার ফলে বাজারে মিশ্র ও অনিশ্চিত পরিবেশ বিরাজ করছে। বিষয়টি নিয়ে বিজনেস রেকর্ডারের প্রতিবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
বিশ্বের প্রধান চাল রপ্তানিকারক দেশ ভারতচলতি সপ্তাহে রপ্তানি মূল্যে মোটামুটি স্থিতিশীলতা রেখেছে। পর্যাপ্ত মজুদের ফলে আন্তর্জাতিক চাহিদা সামান্য বাড়লেও ভারতীয় রফতানি মূল্য তেমন ওঠানামা নেই — ৫ শতাংশ ভাঙা সিদ্ধ চাল প্রতি টন ৩৪৪-৩৫০ ডলার এবং ৫ শতাংশ ভাঙা সাদা চাল প্রতি টন ৩৩৮-৩৪৪ ডলারের মধ্যে অপরিবর্তিত রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক জাহাজ ভাড়া হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় বহু বিদেশি ক্রেতা এখন নতুন অর্ডার দিতে বেশ সতর্কতা অবলম্বন করছেন। ব্যবসায়ীরা বলছেন, পরিবহন খরচ না কমলে রফতানিতে প্রত্যাশিত গতিভাবে উন্নতি আসবে না।
অন্যদিকে ভিয়েতনামে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। ফসল কাটা মৌসুম শেষ হওয়ার পথে থাকায় বাজারে সরবরাহ সংকট গভীর হচ্ছে এবং এ কারণে দামে তীব্র চাপ পড়েছে। বর্তমানে ৫ শতাংশ ভাঙা ভিয়েতনামী চালের দাম প্রতি টন প্রায় ৩৭৭-৩৮০ ডলারের মধ্যে অবস্থান করছে; কোথাও কোথাও বিক্রেতারা ৪৪০ ডলার পর্যন্ত দাম চাচ্ছেন। সরকারী পরিসংখ্যানে দেখা গেছে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ভিয়েতনামের চাল রপ্তানি গত বছরের তুলনায় প্রায় ১.২ শতাংশ কমে প্রায় ২৩ লাখ টনে নেমেছে। সরবরাহ সংকট বজায় থাকলে বিশেষজ্ঞরা ভবিষ্যতে দাম আরও বাড়ার অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত দিচ্ছেন।
থাইল্যান্ডেও অবস্থা উদ্বেগজনক। সেখানে চালের দাম বর্তমানে প্রতি টন ৪১০-৪১৫ ডলারের ঘরে রয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী অনাবৃষ্টি ও খরার ফলে ধান উৎপাদন ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে, আর সার ও জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধির কারণে ভবিষ্যতে মূল্য চাপ আরও বাড়তে পারে। এই প্রবণতা আমদানিকারক দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে জটিল। ইতিমধ্যেই অস্থির বাজারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি সংকট—মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার প্রভাবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন পড়ায় দেশে ডিজেলের তীব্র ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বোরো মৌসুমে সেচের জন্য ডিজেল অপরিহার্য হলেও জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক জায়গায় সেচ কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে উৎপাদন খরচ দ্রুত বাড়ছে এবং বাজারে চালের দামও চড়ছে। সাধারণ চাষি ও নিম্নবিত্ত ভোক্তা দুজনেই এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞরা ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে জ্বালানি ও সরবরাহ সংকট একসাথে থাকলে দেশের সার্বিক খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে খাবারের মূল্য বৃদ্ধির প্রবণতা জোরালো হবে। নিকট ভবিষ্যতে পরিস্থিতি সামাল দিতে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় ক্ষেত্রে সমন্বিত নীতি এবং তাত্ক্ষণিক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে।