হান্টাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের জেরে বিশ্ব স্বাস্থ্য চোখে পড়ে থাকার সময়ে নোরোভাইরাস নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে ক্রুজ জাহাজসহ বিভিন্ন স্থানে ধারাবাহিক সংক্রমণের খবর পরে এই ভাইরাসকে ঘিরে উদ্বেগ বাড়ছে।
বিশেষ করে ২০২৫ সালের শেষ থেকে ২০২৬ সালের শুরু পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে নোরোভাইরাসের একাধিক প্রাদুর্ভাব দেখায় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে সতর্ক হতে হয়েছে। সাম্প্রতিককালে একাধিক ক্রুজ জাহাজে শতাধিক যাত্রীকে আক্রান্ত হতে দেখা গেছে, যা বিশ্বজুড়ে নজর কেড়েছে।
সর্বশেষ ঘটনায়, ফরাসি কর্তৃপক্ষ বোর্দো নৌবন্দরে নোঙর করা একটি ক্রুজ জাহাজে থাকা ১ হাজার ৭০০’র বেশি যাত্রী ও ক্রুকে কোয়ারেন্টিনে রেখেছে। কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, একটি যাত্রীর নোরোভাইরাসে সন্দেহজনক মৃত্যুর পর এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
অ্যাম্বাসেডর ক্রুজ লাইনের ওই জাহাজটি গত মঙ্গলবার বোর্দোতে পৌঁছায়। জাহাজটিতে মোট ১ হাজার ২৩৩ জন যাত্রী ছিলেন, যাদের অধিকাংশই ব্রিটেন ও আয়ারল্যান্ডের নাগরিক। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ৯০ বছর বয়সী এক যাত্রীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে এবং প্রায় ৫০ জনের মধ্যে নোরোভাইরাসের উপসর্গ দেখেন।
এএফপি জানায়, জাহাজটি ৬ মে শেটল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ থেকে যাত্রা শুরু করে উত্তর আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্ট, ব্রিটেনের লিভারপুল এবং ফ্রান্সের ব্রেস্ট বন্দরে যাত্রাবিরতি করে। এর পর জাহাজটি স্পেনের উদ্দেশ্যে চলছিল।
নোরোভাইরাস কী: মার্কিন রোগনিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) বলছে, নোরোভাইরাসকে সাধারণত ‘স্টমাক ফ্লু’ বলা হলেও এটি ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস নয়। এটি একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাস, যা পাকস্থলী ও অন্ত্রে সংক্রমণ ঘটায়। সংক্রমিত হলে বমি, ডায়রিয়া, পেটব্যথা, ঘন ঘন বমিভাব ও দুর্বলতা দেখা যায়। ভাইরাসটি দূষিত খাবার, পানি, আক্রান্ত ব্যক্তির সরাসরি সংস্পর্শ বা দূষিত পৃষ্ঠ স্পর্শ করে দ্রুত ছড়ায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, নোরোভাইরাস বর্তমানে তীব্র গ্যাস্ট্রোএন্টারাইটিস বা ডায়রিয়া-বমি জনিত অসুস্থতার অন্যতম প্রধান কারণ। প্রতি বছর আনুমানিক ৬৮ কোটি ৫০ লাখ (প্রায় ৬৮৫ মিলিয়ন) মানুষ নোরোভাইরাসে আক্রান্ত হন এবং প্রায় ২ লাখ মানুষ প্রাণ হারান, যার বড় অংশ নিম্নআয়ের দেশগুলোর অন cuenta। সংস্থাটি বলছে, নোরোভাইরাসের কারণে স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও অর্থনীতিতেও বড় প্রভাব পড়ে—স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় ও কর্মঘণ্টা ক্ষতি মিলিয়ে বছরে প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলারের মতো ক্ষতি হতে পারে। তাই ভ্যাকসিন উন্নয়নকে তারা অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত উদ্যোগ হিসেবে দেখছে।
কেন এত দ্রুত ছড়ায়: মলিকুলো ডায়াগনস্টিকস কর্তৃপক্ষ জানান, নোরোভাইরাসের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর উচ্চ সংক্রমণ ক্ষমতা। খুব অল্প পরিমাণ ভাইরাসও মানুষের সংক্রমণ ঘটাতে পারে এবং আক্রান্ত ব্যক্তি সুস্থ হওয়ার পরও কয়েকদিন পর্যন্ত ভাইরাস ছড়াতে পারেন। ভাইরাসটি বিভিন্ন পৃষ্ঠে দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে—দরজার হাতল, টেবিল, বাসনপত্র, বাথরুম বা রান্নাঘরের পৃষ্ঠ থেকেই সংক্রমণ হতে পারে। এমনকি বমির ক্ষুদ্র কণাও বাতাসে ছড়িয়ে অন্যদের আক্রান্ত করতে পারে।
ক্রুজ জাহাজ, স্কুল, হাসপাতাল, বৃদ্ধাশ্রম, ক্যাম্পাস বা অন্য কোনো ঘনবসতিপূর্ণ স্থানে নোরোভাইরাস দ্রুত ছড়ায় কারণ সেখানে মানুষ কাছাকাছি থাকে এবং একই খাবার বা সুবিধা ব্যবহার করে।
সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাব কেন উদ্বেগ বাড়িয়েছে: চলতি বছরে সিডিসি ও অন্যান্য সূত্রে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত শত শত প্রাদুর্ভাব নথিভুক্ত হয়েছে। যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা সংস্থাও জানিয়েছে, ২০২৫-২৬ মৌসুমে নোরোভাইরাস সংক্রমণ গত পাঁচ বছরের গড়ের তুলনায় বেশি ছিল, এবং বিশেষ করে হাসপাতালগুলোতে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোভিড-১৯ মহামারির পর আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ও জনসমাগম বেড়ে যাওয়া এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি কিছুটা শিথিল হওয়ায় ঝুঁকি বাড়তে পারে।
লক্ষণ ও চিকিৎসা: ডব্লিউএইচও ও সিডিসির তথ্য অনুযায়ী, নোরোভাইরাসে আক্রান্ত হলে ১২-৪৮ ঘণ্টার মধ্যে উপসর্গ দেখা দেয়। সাধারণ উপসর্গগুলো হলো হঠাৎ বমি শুরু হওয়া, পাতলা পায়খানা, তীব্র বমিভাব, পেট মোচড়ানো ব্যথা, দুর্বলতা, জ্বর ও মাথা-শরীর ব্যথা। সাধারণত এক থেকে তিন দিনের মধ্যে রোগী ভালো হয়ে যায়, তবে শিশু, বয়স্ক ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকা ব্যক্তিদের জন্য এটি বিপজ্জনক হতে পারে—অতিরিক্ত বমি ও ডায়রিয়ার কারণে দুয়নিকতা বা ডিহাইড্রেশন হতে পারে, যা কখনও হাসপাতালে ভর্তি করাতে পারে।
এখনো নির্দিষ্ট ওষুধ বা অনুমোদিত ভ্যাকসিন নেই: নোরোভাইরাসের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষেধক বা চিকিৎসা নেই; চিকিৎসা মূলত উপসর্গ নিরাময়ের ওপর নির্ভরশীল। পর্যাপ্ত তরল এবং ইলেক্ট্রোলাইট সরবরাহ (ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। গুরুতর ক্ষেত্রে শিরার ভিতর থেকে স্যালাইন দিতে হতে পারে।
হাত ধোয়া কেন জরুরি: যুক্তরাজ্যের এনএইচএস ইংল্যান্ডের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নোরোভাইরাস প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকরি পদক্ষেপ হলো সাবান ও পানি দিয়ে ভালো করে হাত ধোয়া; শুধুমাত্র অ্যালকোহলভিত্তিক হ্যান্ড স্যানিটাইজার প্রায়শই যথেষ্ট নয়। টয়লেট ব্যবহারের পর, খাবার তৈরির আগে ও পরে এবং আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে যাওয়ার পর সাবান-পানিতে ভালো করে হাত ধোয়া জরুরি। আক্রান্ত অবস্থায় অন্যের জন্য খাবার প্রস্তুত করা উচিত নয়। আক্রান্ত ব্যক্তির কাপড় ও বিছানাপত্র দ্রুত এবং সাবধানে পরিষ্কার করা, বমি বা মল পরিষ্কার করার সময় গ্লাভস ব্যবহার করা এগুলোও জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, নোরোভাইরাস যদিও অত্যন্ত সংক্রামক, তবুও এটি কোভিড-১৯-এর মতো বৈশ্বিক মহামারিতে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা কম; কারণ মৃত্যুহার তুলনামূলকভাবে কম এবং অধিকাংশ রোগী কয়েক দিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে ব্যাপক সঞ্চারণ হলে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার উপর চাপ তৈরি হতে পারে, বিশেষ করে বৃদ্ধাশ্রম, হাসপাতাল ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)-এর সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেছেন, ‘আমাদের জন্য ঝুঁকি একেবারেই কম। কারণ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আবহাওয়া বা জলবায়ু পরিবর্তনের ধরনের কোনো সংক্রমণ ঝুঁকি বৃদ্ধির কোনো সম্পর্ক এখনো পাওয়া যায়নি।’ তবুও সাধারণ জনস্বাস্থ্য সতর্কতা—পর্যাপ্ত হাত ধোয়া, সংক্রমিত ব্যক্তিদের আলাদা রাখা, এবং সন্দেহজনক উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেয়া—অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।