ক্রমবর্ধমান রাজস্ব ঘাটতি, কর ফাঁকির گستর্ধ্ব মহোৎসব এবং কর অব্যাহতির অপব্যবহার মোকাবিলায় সরকার নতুন ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। রাজস্ব খাতের স্থবিরতা কাটাতে অর্থনৈতিক সংশ্লিষ্ট মন্ত্রালয় তিনটি পৃথক ‘টাস্কফোর্স’ গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার মাধ্যমে আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমসের সংস্কার দ্রুত তরান্বিত হবে। অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরাও এই উদ্যোগকে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সংস্কারের এক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হিসেবেই দেখছেন। সরকারের আশা, এর মাধ্যমে রাজস্ব প্রবাহকে শক্তিশালী করে তোলা সম্ভব হবে, পাশাপাশি কর ব্যবস্থা আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হবে, যা ultimately উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, বিগত কয়েক বছরে বাজেটের আকার ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেলেও, রাজস্ব আদায়ে সেই তুলনায় দৃঢ় অগ্রগতি হয়নি। এর ফলস্বরূপ, উন্নয়নপ্রকল্প, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং সরকারি সেবাখাতে ব্যয় মেটাতে দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা আরও বেড়ে গেছে। দেশের কর-জিডিপি অনুপাতেরও কাঙ্ক্ষিত স্তরে পৌঁছাতে পারছে না। এই পরিস্থিতিতে, কর প্রশাসনের কার্যকারিতা বাড়ানো ও কর ফাঁকিরোধে সবচেয়ে বেশি ঝোঁকের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে সরকার।
সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমসের চ্যালেঞ্জ ও অসঙ্গতিগুলো আলাদা আলাদা। তাই প্রথাগত একক কাঠামোর পরিবর্তে নতুন করে এই তিন খাতের সমস্যা সামাল দিতে পৃথক টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। এই টাস্কফোর্সগুলো হবে—কর ফাঁকির উৎস ও ধরন নির্ণয়, অপ্রয়োজনীয় কর অব্যাহতি বাতিল, অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা চিহ্নিত ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা।
অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানান, প্রতিটি টাস্কফোর্সের জন্য মাসভিত্তিক কার্য পরিকল্পনা ও একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই পরিকল্পনাগুলো কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং নিয়মিত পারফরম্যান্স পর্যালোচনা, অগ্রগতি মূল্যায়ন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সমন্বয় চালানো হবে।
তিনি বলেন, ‘কর ফাঁকি, জালিয়াতি ও অযৌক্তিক কর অব্যাহতি কমিয়ে রাজস্ব আহরণের ভিত্তি শক্তিশালী করতে হবে। আমরা এর মাধ্যমে পুরো রাজস্ব ব্যবস্থা আধুনিক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিপূর্ণ করে তুলতে কাজ করছি।’
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের কর ব্যবস্থার বড় দুর্বলতা হলো করদাতাদের সীমিত ভিত্তি। অর্থনীতির আকার বেড়েও করদাতার সংখ্যা অচল থাকায় আবশ্যকীয় করের বোঝা সবচেয়ে বেশি পড়ছে নিয়মিত করদাতাদের ওপর। নতুন এই টাস্কফোর্সগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখলে সম্ভাবনা আছে রাজস্ব আয়ের রূপরেখায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।
ড. তিতুমীর উল্লেখ করেন, সরকার বর্তমানে একটি ‘থ্রি-স্টেপ’ অর্থনৈতিক কৌশল অনুসরণ করছে—যা হলো আভ্যন্তরীণ স্থবিরতা কাটিয়ে ওঠা, ভোগব্যয় বাড়ানো, বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত ও রপ্তানি বহুমুখী করা। এই কৌশলের অংশ হিসেবেই রাজস্ব ব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কার শুরু হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, অতীতে রাজস্ব তথ্যের অসংগতি ও ধোঁয়াশা ছিল, যা প্রকৃত অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মূল্যায়নে সমস্যা সৃষ্টি করত। এসব দুর্বলতা দূর করতে তথ্য ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা আনয়ন করা হচ্ছে। পাশাপাশি সকল স্তরে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারে জোর দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করান, রাজস্ব প্রশাসনে প্রযুক্তির শতভাগ ব্যবহার নিশ্চিত হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কর ফাঁকি ধরা সম্ভব হবে। এতে করদাতা সেবা পাওয়াও সহজ হবে, ডিজিটাল তথ্যভান্ডার ও স্বয়ংক্রিয় ঝুঁকি বিশ্লেষণের মাধ্যমে রাজস্ব সংগ্রহের সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে।
তবে শুধু রাজস্ব বৃদ্ধি নয়, সরকারের জন্য অন্য বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে পরিচালনায় ব্যয় ও উন্নয়ন ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা। অর্থ উপদেষ্টার মতে, বর্তমানে প্রশাসনিক ব্যয় দ্রুত বাড়লেও মূলধনী ও উন্নয়ন ব্যয় সেই অনুপাতে বাড়ছে না, যা দেশের অর্থনৈতিক গতি কমিয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে, চালু প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন না হওয়া ও নির্মাণের ধীর গতির বিষয়েও তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
ড. তিতুমীর বলেন, প্রকল্পের অনুমোদন, বাস্তবায়ন, তদারকি ও মূল্যায়নে ব্যাপক সংস্কার দরকার। সরকার আশা করছে, একটি ‘ড্যাশবোর্ডভিত্তিক ডিজিটাল মনিটরিং’ চালু হলে প্রকল্পের অগ্রগতি ও ব্যয় অতি দ্রুত পর্যবেক্ষণ সম্ভব হবে। এছাড়া উন্মুক্ত তথ্যনীতি অনুসারে গবেষক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ তথ্য পেতে পারবে সুবিধাজনকভাবে।
ব্যবসায়ী মহলের পক্ষ থেকে সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও, বাস্তবায়নের জন্য তারা সতর্ক। মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রেসিডেন্ট কামরান টি রহমান বলেন, আধুনিকায়ন ও ডিজিটালাইজেশন ইতিবাচক হলেও, কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া বিশাল রাজস্ব টার্গেট অর্জন অসম্ভব। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, নতুন করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ দিচ্ছে, যা ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তিনি আরও বলেন, করদাতাদের জন্য সংগ্রাম ও হয়রানি রোধে শক্তিশালী ও ‘করদাতা-বান্ধব’ প্রশাসন গড়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই তিনটি টাস্কফোর্স গঠন সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা। বিগত দুই দশকে অনেকবার সংস্কার বললেও বাস্তবে তার দেখা মিলেনি। এবার যদি তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও নিয়মিত জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে রাজস্ব আদায়ে।
পরবর্তী অর্থবছরে সরকারের বাজেট, ঘাটতি, এবং ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের সফলতা পুরোপুরি নির্ভর করছে এই সংস্কারের ফলাফলের উপর। তাই এই তিন টাস্কফোর্সকে কেবল প্রাথমিক বা রুটিন পদক্ষেপ ভাবার সুযোগ নেই; এর মাধ্যমে দেশে ভঙ্গুর রাজস্ব ব্যবস্থার ভবিষ্যত রূপান্তর শুরু হবে।