বৃহস্পতিবার, ৯ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৫শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফিফা ‘পাওয়ার র‍্যাঙ্কিং’ চালু — এমবাপ্পে শীর্ষে, মেসি দ্বিতীয়

ফুটবল এখন কেবল গোল করার খেলা নয়—এমন ব্যাখ্যা করে ফিফা উন্মোচন করেছে তাদের নতুন উদ্যোগ ‘ফিফা পাওয়ার র‍্যাঙ্কিং’। ২০২৬ বিশ্বকাপকে মাথায় রেখে চালু হওয়া এই উচ্চমাত্রার প্রকল্পে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে প্রতিটি খেলোয়াড়ের প্রতিক্রিয়া, অবস্থান ধরে থাকা, পাসের যোগ্যতা এবং ম্যাচে যে অনদেখা অবদানগুলো থাকে তা মাপা হবে।

সৌদি আরবের জ্বালানি বিশাল সংস্থা আরামকোয়ের প্রযুক্তি ও আর্থিক সহযোগিতায় তৈরি এই ব্যবস্থা ফুটবলের প্রচলিত মূল্যায়নকে বদলে দেবে—গোল বা অ্যাসিস্ট ছাড়া অন্য দায়িত্বও এখন সমানভাবে মনে করা হবে। ফিফার গ্লোবাল ফুটবল ডেভেলপমেন্ট প্রধান ও সাবেক আর্সেনাল কোচ আর্সেন ওয়েঞ্জারের নেতৃত্বে এই প্রকল্পটি চালু হয়েছে। ওয়েঞ্জারের মন্তব্য, ‘ফুটবল এখন ডেটা বা তথ্যের খেলা। আমরা এমন একটি ব্যবস্থা চেয়েছি যা ভক্তদের দেখাবে কেন একজন খেলোয়াড় গোল না করেই ম্যাচের সেরা হতে পারেন।’

কীভাবে কাজ করবে

ফিফা বলছে প্রতিটি খেলোয়াড়কে ০ থেকে ১০ পয়েন্ট স্কেলে মূল্যায়ন করা হবে। আউটফিল্ড খেলোয়াড় ও গোলরক্ষকদের জন্য আলাদা আলাদা মানদণ্ড রাখা হয়েছে।

আউটফিল্ড খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে তিনটি ভাগে মূল্যায়ন হবে:

– অ্যাটাকিং: শুধুমাত্র গোল নয়, প্রতিপক্ষ বক্সে কতটা সমস্যার সৃষ্টি করলেন, ডিফেন্সরদেরকে কতটা টেনে নিয়ে এলেন—এসব বিবেচনায় থাকবে।

– ক্রিয়েটিভিটি: দূরদৃষ্টি, পাসের সঠিকতা ও আক্রমণ গড়া—একজন খেলোয়াড় কতটা সুযোগ তৈরিতে কার্যকর তা এখানে মাপা হবে।

– ডিফেন্ডিং: আক্রমণ আগেভাগে পড়া, ইন্টারসেপশন ও ট্যাকলিং দক্ষতা—রক্ষণের গোপন অবদানগুলোও মূল্যায়ন করা হবে।

গোলরক্ষকদের জন্য দুটি বিভাগ থাকবে:

– গোল রক্ষা: সেভ, রিফ্লেক্স, গোলরেখায় প্রতিক্রিয়া—গোল বাঁচানোর দক্ষতা।

– বল দখল ও বিল্ড-আপ: আধুনিক গোলরক্ষকের মতো নিচ থেকে খেলা গড়ে দেওয়ার দক্ষতা।

নিয়ম ও আপডেট

ফিফা জানিয়েছে কোনো পক্ষপাত নেই—ডেটা ও অ্যালগরিদম ভিত্তিক এই ব্যবস্থা স্বচ্ছভাবে কাজ করবে। অন্তর্ভুক্তির ন্যূনতম শর্ত হিসেবে বলা হয়েছে কোনো খেলোয়াড়কে ওই ম্যাচে অন্তত ২০ মিনিট খেলতে হবে। ম্যাচ শেষের মাত্র চার ঘণ্টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড়দের স্কোর উন্মুক্ত করা হবে এবং প্রতিটি রাউন্ড শেষে ‘সেরা ১০০’ তালিকা প্রকাশ করা হবে। টুর্নামেন্ট শেষে একটি চূড়ান্ত সামগ্রিক র‍্যাঙ্কিংও দেওয়া হবে।

বর্তমান শীর্ষ দশ

ফিফার অ্যালগরিদম ও সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে আপাতত শীর্ষে রয়েছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। গোল করার দক্ষতার পাশাপাশি তার আক্রমণের বলবৎ উপস্থিতি তাকে এগিয়ে রেখেছে। দ্বিতীয় স্থানে আছেন লিওনেল মেসি, যাঁর ক্রিয়েটিভিটি এখনও বিশ্বের শীর্ষে বিবেচিত। নিচে ফিফা পাওয়ার র‍্যাঙ্কিংয়ের বর্তমান শীর্ষ ১০ সংক্ষিপ্তভাবে দেওয়া হলো:

01 কিলিয়ান এমবাপ্পে (ফ্রান্স) — অ্যাটাকিং 8.71, ক্রিয়েটিভিটি 7.52, ডিফেন্ডিং 4.71 — শীর্ষে

02 লিওনেল মেসি (আর্জেন্টিনা) — অ্যাটাকিং 8.45, ক্রিয়েটিভিটি 7.05, ডিফেন্ডিং 4.53 — রানার-আপ

03 আরলিং হালান্ড (নরওয়ে) — অ্যাটাকিং 8.04, ক্রিয়েটিভিটি 4.84, ডিফেন্ডিং 5.31 — গোল মেশিন

04 হ্যারি কেন (ইংল্যান্ড) — অ্যাটাকিং 7.41, ক্রিয়েটিভিটি 5.01, ডিফেন্ডিং 4.84 — নির্ভরযোগ্য

05 মানজাম্বি (সুইজারল্যান্ড) — অ্যাটাকিং 7.32, ক্রিয়েটিভিটি 6.92, ডিফেন্ডিং 4.75 — ডার্ক হর্স

06 জুড বেলিংহ্যাম (ইংল্যান্ড) — অ্যাটাকিং 7.30, ক্রিয়েটিভিটি 6.41, ডিফেন্ডিং 5.87 — অল-রাউন্ডার

07 ভিনিসিয়ুস জুনিয়র (ব্রাজিল) — অ্যাটাকিং 7.20, ক্রিয়েটিভিটি 7.17, ডিফেন্ডিং 4.65 — ড্রিবলিং কিং

08 কিনিওনেস (মেক্সিকো) — অ্যাটাকিং 6.98, ক্রিয়েটিভিটি 6.85, ডিফেন্ডিং 5.31 — উদীয়মান

09 উসমান দেম্বেলে (ফ্রান্স) — অ্যাটাকিং 6.97, ক্রিয়েটিভিটি 6.91, ডিফেন্ডিং 4.88 — গতির রাজা

10 সামারভিল (নেদারল্যান্ডস) — অ্যাটাকিং 6.78, ক্রিয়েটিভিটি 7.11, ডিফেন্ডিং 5.13 — টেকনিক্যাল

বিশ্লেষক প্রতিক্রিয়া

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ব্যবস্থা ক্লাব-নির্বাচন ও ট্রান্সফার মার্কেটে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। শুধুমাত্র গোলের কাগজ না দেখে, ডেটা-ভিত্তিক পারফরম্যান্স মূল্যায়ন ক্লাবগুলোকে আরও বিবেচিত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে। অনেকেই মনে করছেন ২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে প্রথম ‘ফুললি ডেটা-ড্রিভেন’ টুর্নামেন্ট হবে।

শেষ কথায়

মাঠে ঘাম ঝরানো খেলোয়াড়দের কাজ এখন থেকে প্রযুক্তির চোখে আরও খোলাসা হবে। ভক্তদের জন্য ফুটবল সম্ভবত আরও স্বচ্ছ, পরিমাপযোগ্য এবং নতুনভাবে রোমাঞ্চকর হয়ে উঠবে—তবে প্রশ্ন থাকবে প্রযুক্তির নিরপেক্ষতা ও মানুষের বিচার-ধারার ভূমিকা কতটা থাকবে। যে কোনো ক্ষেত্রে, ফুটবলের পরবর্তী অধ্যায়টি এবার তথ্যের সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে জড়িত হয়ে উঠল।

পোস্টটি শেয়ার করুন