বৃহস্পতিবার, ৯ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৫শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রপ্তানিতে নতুন দিগন্ত: বাংলাদেশের মোটরসাইকেল শিল্প

দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা ছাড়িয়ে এখন বিশ্ববাজারে পা বাড়াচ্ছে বাংলাদেশের মোটরসাইকেল শিল্প। দেশীয় কারখানাগুলো বছরে প্রায় ৮ লাখ ইউনিট উৎপাদন ও সংযোজনের সক্ষমতা অর্জন করেছে; যেখানে দেশের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৫ লাখ ইউনিট—এই উদ্বৃত্ত সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারের লক্ষ্যে উদ্যোগ বাড়াচ্ছেন নির্মাতারা।

মন্দা কাটিয়ে উঠছে খাত: ২০২০ সালে প্রায় ৬ লাখ ২৫ হাজার ইউনিটের বিশাল বাজার থাকা সত্ত্বেও করোনা মহামারি ও দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতি শিল্পকে শক্তটু চাপ দিয়েছিল। টানা পাঁচ বছরের মন্দার পর এখন খাত নিয়মিতভাবে সুস্থ হচ্ছে। সর্বশেষ অর্থবছরে বিক্রিতে ৮ শতাংশ বাড়ি এসে তা ৪২৪,৩০৪ ইউনিট দাঁড়িয়েছে। ডলার সংকট ও আমদানির নীতিতে কড়াকড়ির কারণে সরবরাহ কিছুটা বিঘ্নিত হলেও এলসি সুবিধা ও বৈদেশিক মুদ্রার পরিস্থিতির উন্নতির ফলে ক্রেতারা ধীরে ধীরে ফিরছে।

গত এক দশক ধরে খাতে বড় পরিবর্তন দেখা গেছে—দশ বছর পূর্বে দেশের রাস্তাঘাটে ৯৫ শতাংশ মোটরসাইকেল আমদানি করা হত; এখন যেসব মোটরসাইকেল সড়কে চলছে তার প্রায় ৯৯ শতাংশই দেশের ১০টি আধুনিক কারখানা থেকে আসে। প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগে গড়ে ওঠা এই শিল্পটি সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সরকারের শুল্ক কমানো এবং রাইড-শেয়ারিং সেবার প্রসারে এই সাফল্যের পথ আরও প্রশস্ত হয়েছে।

বাজারের শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ডসমূহ: ২০২৫ সালের সাম্প্রতিক তথ্য মতে ইয়ামাহা ও হোন্ডা শীর্ষ লড়াইয়ে এগিয়ে আছে। ইয়ামাহা ২০.৮ শতাংশ বাজার শেয়ার নিয়ে শীর্ষে—বিক্রির পরিমাণ ৮৮,২৮৯ ইউনিট; হোন্ডা ২০ শতাংশ শেয়ারে এর নিকটেই অবস্থান করছে। এছাড়া সুজুকি, হিরো ও বাজাজও শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে। জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ও যুক্তিসংগত মূল্য হওয়ায় জাপানি ও ভারতীয় ব্র্যান্ডগুলো ক্রেতাদের প্রথম পছন্দে পরিণত হয়েছে।

রপ্তানির নতুন মাইলফলক: এখন বাংলাদেশি ব্র্যান্ডগুলো বিদেশের পথে রপ্তানি শুরু করেছে। বাংলাদেশ হোন্ডা মেক্সিকো ও গুয়াতেমালা’র মতো বড় বাজারে পণ্য পাঠিয়ে নতুন নজির গড়েছে—মুন্সীগঞ্জের অর্থনৈতিক অঞ্চল থেকে প্রেরিত চালানগুলো ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগকে বিশ্ববাজারে তুলে ধরছে। পাশাপাশি দেশীয় ব্র্যান্ড রানার অটোমোবাইলস নেপাল ও ভুটানে নিয়মিত রপ্তানি চালাচ্ছে, যা খাতের জন্য বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত।

চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা: রপ্তানিতে সাফল্য থাকলেও যে সমস্যাগুলো বাকি রয়েছে সেগুলো দ্রুত সমাধান না হলে গতি ধীর হতে পারে। একটি মোটরসাইকেল বানাতে প্রায় ৭০০টিরও বেশি যন্ত্রাংশ লাগে; কিন্তু বর্তমানে দেশের ভিতরে মাত্র কয়েকটি মূল অংশ—চেইন ড্রাইভ, সিট, স্ট্যান্ড ও ব্যাটারি—ই তৈরি হচ্ছে। ফলে অনেক যন্ত্রাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়, যা উৎপাদন খরচ বাড়ায়। নিকটস্থ বন্দর ও শুল্ক সংক্রান্ত জটিলতা, পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় পর্যাপ্ত কর-সুবিধার অভাবও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় খাতকে পিছিয়ে রাখছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রকৃত অর্থে বিশ্বমানের হবার জন্য ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ বা যন্ত্রাংশ উৎপাদনের সহায়ক শিল্পকে শক্ত করা জরুরি। স্থানীয় অংশ উৎপাদনে বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে সরকারের নতুন প্রণোদনা দরকার—বিশেষ কর-ছাড়, ভ্যাট মুক্তি বা প্রণোদনা, এবং সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা খাতকে ত্বরান্বিত করতে পারে। এসব নির্দেশনা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের ওপর নির্ভরতা কমে যাবে এবং আঞ্চলিক উৎপাদন হাবে রূপ নেয়ার সম্ভাবনা গুরুত্বপূর্ণভাবে বাড়বে; ফলে ভারতীয় বা ভিয়েতনামি নির্মাতাদের সঙ্গে পাল্লা দেওয়াও সহজ হবে।

পোস্টটি শেয়ার করুন