বৃহস্পতিবার, ৯ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৫শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেলবিক্রির বিশেষ ছাড় বাতিল করেছে

যুদ্ধবিরতির সময় সতততই উত্তেজনা বাড়ার মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ভেতরে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়ে পরিস্থিতি আরও প্রলম্বিত করেছে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন তেহরানের তেলবিক্রির ওপর দেওয়া বিশেষ ছাড় বাতিল করার ঘোষণা দিয়েছে, যার প্রভাবতে আন্তর্জাতিক কাঁচা তেলের দাম ইতোমধ্যে তিন শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। মার্কিন প্রশাসন হরমুজ প্রণালীতে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার অভিযোগ তুলে এই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, সামরিক অভিযানে ইরানের প্রায় ৮০টিরও বেশি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা হয়েছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর অন্তত ৬০টি ছোট নৌযান ধ্বংস করা হয়েছে। এছাড়া উপকূলীয় নজরদারি ব্যবস্থা, আকাশ প্রতিরক্ষা ইউনিট, জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ও ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলোও লক্ষ্যবস্তু ছিল। সেন্টকমের বক্তব্য, ইরানের সাম্প্রতিক কার্যক্রম আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের স্বাধীনতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এজন্য ইরানকে ‘‘উচ্চ মূল্য’’ দিতে বাধ্য করা হয়েছে।

বিপরীতে ইরানের খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্স মার্কিন হামলাকে ‘নগ্ন আগ্রাসন’ বলে অভিহিত করেছে এবং পাল্টা প্রতিরোধের হুঁশিয়ারি জারি করেছে; তারা স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে কোনো মার্কিন হস্তক্ষেপ মেনে নেওয়া হবে না। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে জানানো হয়েছে যে, বুধবার ভোরে খার্গ দ্বীপসহ কেশম, সিরিক ও বন্দর আব্বাস অঞ্চলে প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। সিরিক এলাকায় একটি বাণিজ্যিক জেটি প্রক্ষেপণের আঘাতে আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার পাশাপাশি কয়েকজন আহত হয়েছেন এবং মাছ ধরার নৌকা ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খার্গ দ্বীপ থেকেই ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল রপ্তানি হয়ে থাকে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

সামরিক চাপের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে ইরানকে আলাদাভাবে টার্গেট করেছে। ২২ জুন দেওয়া বিশেষ ছাড় বা সাধারণ লাইসেন্স বাতিল করে ওয়াশিংটন জানিয়েছে, এবার থেকে তেহরান আন্তর্জাতিক বাজারে পেট্রোকেমিক্যাল বা জ্বালানি পণ্য বিক্রি করতে অযোগ্য হবে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, আগামী ১৭ জুলাইয়ের মধ্যে সব ধরণের বাণিজ্যিক লেনদেন বন্ধ করতে হবে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই সিদ্ধান্তকে যুদ্ধবিরতির সমঝোতা লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে এবং এর ফলাফল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকেই দায়ী করতে চাচ্ছে।

হরমুজ প্রণালির উত্তেজনার কেন্দ্রে কাতার ও সৌদি আরবের বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার অভিযোগ দাঁড়িয়েছে; কাতার জানিয়েছে তাদের একটি গ্যাসবাহী জাহাজে ড্রোন হামলা হয়েছে, যা তেহরান প্রত্যাখ্যান করেছে। রাজনৈতিক বিবৃতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কড়া অবস্থান নিয়ে বলেছেন, ‘হয় আমরা একটি চুক্তিতে পৌঁছাব, নয়তো কাজ শেষ করে দেব।’ এর বিপরীতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছে, মার্কিন হুমকি অব্যাহত থাকলে স্থায়ী শান্তি চুক্তি নিয়ে কোনো আলোচনা সম্ভব হবে না।

দুই দেশের এই প্রতিপক্ষতামূলক অবস্থান ও সামরিক‑অর্থনৈতিক চাপের ফলে ঘাঁটঘাঁট করে বাড়ছে ওই অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনার আশঙ্কা। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য ওঠানামা এবং নৌ চলাচলের ঝুঁকি প্রকৃত অর্থেই বিশ্ব অর্থনীতির উপর প্রভাব ফেলতে পারে, ফলে কূটনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করা এখন সময়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

পোস্টটি শেয়ার করুন