গাজীপুরের টঙ্গীর একটি অভিজাত রিসোর্টের চারতলা কক্ষে বাইরে দেখলে ভ্রমণকারীদের আনাগোনা মনে হলেও ঘরের ভেতরে চলছিল প্রযুক্তিভিত্তিক একটি বড় ধাঁচের অপকর্ম। টেবিলজুড়ে সাজানো ছিল সত্তরটিরও বেশি স্মার্টফোন, ল্যাপটপ এবং হাজার হাজার সিম কার্ড—কোনো জুতোর বোর্ড বা ক্যাসিনো চিপ নেই, তবু ডিভাইসগুলোর মাধ্যমে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার লেনদেন চলত।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) জানিয়েছে, গাজীপুর ও কুমিল্লায় অভিযান চালিয়ে অনলাইন জুয়া পরিচালনা করা এক সংঘবদ্ধ চক্রের ছয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অভিযানে জব্দ করা হয়েছে ল্যাপটপ, ৭০টিরও বেশি স্মার্টফোন এবং মোট ৬ হাজার ৬০০টি সচল সিম—তার ওপর আরও ৬৭টি অতিরিক্ত সিম পাওয়া গেছে।
ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান। তিনি জানান, টঙ্গীর রিসোর্ট এবং কুমিল্লার একটি হোটেলে পৃথক অভিযান চালিয়ে সন্দেহভাজনরা গ্রেপ্তার হন।
গ্রেপ্তারদের মধ্যে আছেন আরিফুল ইসলাম রিফাত (২৩), আরমান হোসেন জিহাদ (২৩), মাসুদ হোসেন (২২), আবদুল রাব্বী (২৩), কৌশিক আহমেদ শুভ (২৩) এবং মশিউর রহমান তারেক (২০)। প্রথম দফায় টঙ্গীতে গিয়ে রিফাতসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়; তাদের ল্যাপটপ ও মোবাইল তখনো সচল ছিল এবং লাইভ ট্রানজেকশন চলছে। এরপর প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে কুমিল্লায় অভিযান চালিয়ে বাকি তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ডিবির সাইবার ক্রাইম অ্যান্ড নজরদারি ইউনিট কয়েক মাস ধরেই কিছু সন্দেহজনক আইপি ঠিকানা ও অস্বাভাবিক মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেনের তথ্য নজরে রেখেছিল। তদন্তে দেখা যায়—দেশে বসে আন্তর্জাতিক অনলাইন জুয়ার ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপ পরিচালিত হচ্ছিলো এবং এ প্ল্যাটফর্মগুলোতে টাকা জমা ও উত্তোলনের কাজে দেশীয় মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (বিকাশ, নগদ, রকেট ইত্যাদি) ব্যবহার করা হত।
পুলিশ বলছে, এই চক্র প্রতিদিন প্রায় ৫ কোটি টাকার লেনদেন করত; মাসিক হিসেবে তা দাঁড়াত প্রায় ১৫০ কোটি টাকার মতো। তারা টাকা ৬ হাজার ৬০০টির বেশি এমএফএস-সংযুক্ত সিমে ছড়িয়ে জমা করে, মাঠ পর্যায়ের এজেন্টরা পরে ক্যাশ-আউট করে নির্দিষ্ট ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা রাখত। এরপর ওই অর্থ অবৈধ ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিয়োগ বা পিয়ার-টু-পিয়ার (P2P) প্ল্যাটফর্মে USDT ইত্যাদিতে রূপান্তর করে দ্রুতই আন্তর্জাতিক অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দিত। ফলে বড় অংকের লেনদেন ট্র্যাক করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং দেশের বৈদেশিক রিজার্ভে প্রভাব পড়ছিল।
তদন্তে আরও জানা গেছে, সিম সংগ্রহে এই চক্র গ্রাম ও শহরের নিম্নবিত্ত বা অসচেতন মানুষের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করত কিংবা অসাধু সিম বিক্রেতাদের মাধ্যমে ভুয়া বায়োমেট্রিক নিবন্ধন করত। জব্দকৃত নথি ও রেজিস্টারখাতায় প্রতিদিনের হাজার হাজার এমএফএস অ্যাকাউন্টের নম্বর ও লেনদেনের হিসাব হাতে লেখা রাখা ছিল—ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট এড়াতে তারা অ্যানালগ পদ্ধতি ব্যবহার করতো।
সিমগুলোর কার্যক্রমও সুসংগঠিত ছিল: কিছু সিম কেবল জুয়ারিদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার (ক্যাশ-ইন) জন্য, কিছু সিম ব্যবহার করা হত এক অ্যাকাউন্ট থেকে অন্যে টাকা স্থানান্তরের জন্য, আর কিছু নির্দিষ্ট সিম রাখা হত চূড়ান্ত ক্যাশ-আউটের জন্য।
ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, তদন্তে এই চক্রের আন্তর্জাতিক সংযোগের তথ্য উঠে এসেছে। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, প্রধান হোতা ‘নাতান’ নামের এক চীনা নাগরিক। তিনি নেপথ্য থেকে পুরো নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতেন এবং স্থানীয় এজেন্টদের কমিশন দেখে কাজে লাগাতেন। নাতানকে গ্রেপ্তারের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা খোঁজা হচ্ছে।
এই সংঘবদ্ধ অপরাধে গ্রেপ্তারদের বয়স ২০ থেকে ২৩ বছরের মধ্যে—যা সামাজিক উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সহজে দ্রুত অর্থোপার্জনের লোভ, বিলাসবহলের আকর্ষণ এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির অপব্যবহার তরুণদের অপরাধের দিকে টেনে এনেছে। সে সঙ্গে এই প্ল্যাটফর্মগুলোতে প্রতিদিন লাখ-লাখ সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও যুবসমাজ অর্থহীন হচ্ছে; কেউ কেউ চুরি, ছিনতাই বা পারিবারিক সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ছে।
এই ঘটনার থেকে কিছু নীতিগত দুর্বলতাও স্পষ্ট হয়েছে: এক ব্যক্তির নামে সর্বোচ্চ ১৫টি সিমের বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও শত শত নথিভুক্ত সিম দেখা যায়—বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের কাজে ফাঁকফোকর রয়েছে। এমএফএস প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে লেনদেন মনিটরিং আরও কড়া ও আধুনিক করার প্রয়োজন। পাশাপাশি, ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়মবহির্ভূত পিটুপি মার্কেট নজরদারিতে না রাখলে টাকা পাচার রোধ কঠিন হবে।
টঙ্গী ও কুমিল্লার এই অভিযান ডিবির জন্য বড় সাফল্য, কিন্তু এটাকে কেবল হিমশৈলের চূড়া বলা যাচ্ছে—অপরাধীরা এখন প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঘরে বসেই দেশের অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। অবৈধ সিম-বিক্রি বন্ধ করা, এমএফএস সেবাদাতাদের ট্রানজেকশন নজরদারি শক্ত করা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় নাতানসহ নেপথ্য সহযোগীদের খোঁজ করা সময়ের দাবি। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে এ ধরনের অপরাধ রুখে দেওয়া কঠিন হবে।