সোমবার, ৯ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৪শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

গ্রামের নারীদের অনুপ্রেরণার নাম মুর্শিদা

নাটোরের লালপুর উপজেলার সন্তোষপুর গ্রামের মুর্শিদা খাতুনের জীবন শুরু হয়েছিল অনিশ্চয়তা ও তীব্র অর্থনৈতিক কষ্টে। নবম শ্রেণিতে পড়াকালীন বিয়ের পরে অল্প বয়সেই সংসারের ভার নিতে হয় তাকে। স্বামী নুরুল ইসলাম তখন বেকার; সংসার চালানোর দায় পড়ে মুর্শিদার কাঁধে। তিনি সেলাই মেশিনে দর্জির কাজ করে সংসার চালাতেন, কিন্তু হাল ছাড়েননি—অদম্য পরিশ্রম ও আত্মবিশ্বাসে ধীরে ধীরে নিজের ভাগ্য বদলে নিয়েছেন তিনি।

২০১০ সালে উপজেলা যুব উন্নয়ন অফিস থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে মুর্শিদা মাত্র ১০ হাজার টাকা ক্ষুদ্রঋণ পান। সেই টাকায় একটি গাভী কিনে গরুপালনের পথে পা রাখেন। ছোট্ট সেই উদ্যোগ কালের সঙ্গে বড় খামারে রূপ নেয়। আজ তার নিজস্ব খামার ‘গ্রামীণ এন্ড ডেইরি এগ্রো ফার্ম’-এ প্রায় ২০টি গরু রয়েছে; এসব গরুর বাজারমূল্য আনুমানিক ১৫ লাখ টাকা। খামার থেকে বছরে প্রায় ৪ লাখ টাকার আয় হয় বলে জানান তিনি।

শুধু গরু পালন নয়—খামারকে কেন্দ্র করে বহুমুখী উদ্যোগ গড়ে তুলেছেন মুর্শিদা। গরুর গোবর থেকে বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট করে পাশের কয়েকটি বাড়িতে গ্যাস সরবরাহ করছেন, আর তৎপর্যপূর্ণভাবে সেই প্ল্যান্ট থেকে উৎপন্ন জৈব সার ব্যবহার করছেন নিজের জমিতে। বাড়ির পাশে বড় পুকুরে মাছ চাষ করছেন এবং উঠানে হাঁস-মুরগিও পালন করেন। এসব কার্যক্রমে তিনি একহাতে খামার চালান, আর অন্য হাতে পরিবেশবান্ধব ও লাভজনক কৃষি অনুশীলনও চালু রেখেছেন।

গ্রামে মুর্শিদার সাফল্যের গল্প দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। তার খামার দেখেই অনেকে গরু পালন শুরু করেছেন; অনেকেই সরাসরি তাঁর কাছ থেকে পরামর্শ নিচ্ছেন। একই গ্রামের জরিনা বেগম বলেন, মুর্শিদা আপার খামার দেখে সাহস পেয়েছি; আগে ভাবতাম গরু পালন আমার জন্য সম্ভব নয়, এখন তাঁর পরামর্শে নিজেই শুরু করেছি।

আরেক নারী সমতাও মুর্শিদার অনুপ্রেরণায় গরু পালন শুরু করেন; এখন তাঁর খামারে ৪টি গরু রয়েছে। সমতা বলেন, ‘মুর্শিদা আপা আমাদের অনেক সহযোগিতা করেন। তাঁর কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে ধীরে ধীরে খামার বড় করার স্বপ্ন দেখছি।’

মুর্শিদা খাতুন নিজে বলেছেন, ‘যুব উন্নয়ন অফিস থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে ১০ হাজার টাকা ঋণ পাই। সেই টাকায় প্রথম গাভী কিনেছিলাম। পরে ধীরে ধীরে গরুর সংখ্যা বাড়াই এবং খামারকে বহুমুখী উদ্যোগে রূপ দিই। এখন সংসারও ভালোভাবে চলছে।’

লালপুর উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা আব্দুস সবুর মুর্শিদাকে সফল নারী উদ্যোক্তার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ ও ক্ষুদ্রঋণকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে মুর্শিদা নিজের জীবন বদলে দিয়েছেন। তাঁর অদম্য চেষ্টায় গ্রামবাসী বিশেষ করে নারীরা অনুপ্রাণিত হয়েছেন।’ আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রেক্ষাপটে মুর্শিদার এই গল্প গ্রামীণ নারীদের জন্য প্রেরণার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মুর্শিদার কাহিনি দেখায়, সুযোগ ও প্রশিক্ষণ দিলে শহর-গ্রাম নির্বিশেষে নারীরাও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারে—সফলতার এক জীবন্ত দৃষ্টান্ত পেছনে লেগে থাকা শ্রম, ধৈর্য ও সঠিক সহায়তা।

পোস্টটি শেয়ার করুন