বুধবার, ১১ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৬শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

হরমুজ সংকটে সৌদি আরব চালু করছে ‘ইস্ট-ওয়েস্ট’ পাইপলাইন

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ও হরমুজ প্রণালী কার্যত অচল হয়ে পড়ায় তেল রপ্তানির বিকল্প পথ জোরদার করছে সৌদি আরব। দেশটি উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে রপ্তানি সচল রাখতে তাদের পুরনো ‘ইস্ট-ওয়েস্ট’ পাইপলাইনকে পূর্ণ সক্ষমতায় ব্যবহার করার দিকে এগোচ্ছে, জানিয়েছে মিডল ইস্ট আই।

অবকাঠামো সংকট: গত কয়েক দিন ছোঁয়ায় ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েল সংঘর্ষের প্রভাব এবং হরমুজে চলাচল ঝুঁকিতে পড়ার ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধাক্কা লেগেছে। এই পরিস্থিতিতে চার দশক আগে নির্মিত সৌদি ‘ইস্ট-ওয়েস্ট’ লাইনটি নতুন করে কৌশলগত গুরুত্ব পেল।

সৌদি আরামকোর প্রধান নির্বাহী আমিন নাসের বলেন, কয়েক দিনের মধ্যে পাইপলাইনটির দৈনিক সরবরাহ সক্ষমতা ৭০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেলে পৌঁছবে। আবকাইক তেলক্ষেত্র থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরের মধ্যে প্রায় ৭৫০ মাইল দীর্ঘ এই রুট এখন উপসাগরীয় রপ্তানির বড় ভরসা হয়ে উঠেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি সৌদি আরবের কৌশলগত প্রত্যুত্তর: সাময়িকভাবে হরমুজে অবকাঠামো ঝুঁকি থাকা অবস্থায় তেল সরবরাহ চালু রাখার উদ্দেশ্যেই পাইপলাইনটি ব্যবহার করা হচ্ছে। রাইস ইউনিভার্সিটির জ্বালানি বিশেষজ্ঞ জিম ক্রেইন বলেন, এটি হঠাত্‍ ঘটে যাওয়া সংকট মোকাবিলায় কার্যকর বিকল্প হতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়।

সীমাবদ্ধতাও আছে: গত বছর সৌদি আরব প্রতিদিন প্রায় ৬৩ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত এবং ১৪ লাখ ব্যারেল পরিশোধিত তেল রপ্তানি করেছিল। কিন্তু ইয়ানবু বন্দরের বাস্তবিক সক্ষমতা দিনে প্রায় ৪৫ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানিতে সীমাবদ্ধ — ফলে পুরো পরিমাণ মেটানো সহজ হবে না।

শিল্পে আরও উদ্বেগ আছে: বিশ্ববাজারে কাঁচা তেলের পাশাপাশি ডিজেল ও জেট ফুয়েলের মতো পরিশোধিত জ্বালানির ঘাটতিও বাড়ছে। ট্রান্সভার্সাল কনসাল্টিংয়ের বিশ্লেষক এলিন ওয়াল্ড সতর্ক করেছেন, যদি পাইপলাইনটি পুরোপুরি অপরিশোধিত তেল বহনে ব্যস্ত থাকে তবে প্রাকৃতিক গ্যাস এবং অন্যান্য জ্বালানি পণ্যের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে, যা ইউরোপের মতো অঞ্চলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

লোহিত সাগরপথও ঝুঁকির মুখে: ইয়ানবু দিয়ে এশিয়া যাওয়া তেলবাহী জাহাজগুলোকে বাব আল-মানদেব প্রণালী পেরোতে হয় — এটি紅 সাগর ও আদেন উপসাগরের সাক্ষাতে থাকা একটি সংকীর্ণ চোকপয়েন্ট। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা না করলেও তাদের ড্রোন হামলার ক্ষমতা এ নৌপথকে ঝুঁকির সামনে নিয়ে এসেছ। সেন্টার ফর দ্য ন্যাশনাল ইন্টারেস্টের গ্রেগ প্রিডি বলেন, হুতিদের হামলা যদি বাড়ে তবে রুটটি তুরণীয়ভাবে ঝুঁকির সম্মুখীন হবে।

এদিকে ইরান এখন পর্যন্ত সৌদি অবকাঠামোতে স্থায়ী ক্ষতি সাধনের দিকে শনাক্তভাবে এগোচ্ছে না, কিন্তু বিশ্লেষকদের আশঙ্কা হুতিগণ সরাসরি সংঘাতে জড়ালে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। বর্তমানে হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ থাকায় প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেলের বেশি জ্বালানির ঘাটতি তৈরি হয়েছে এবং ব্রেন্ট ক্রুডের দামও অনিশ্চয়তার কারণে ওঠানামা করছে।

সংক্ষেপে, ‘ইস্ট-ওয়েস্ট’ পাইপলাইন সৌদি আরবের জন্য জরুরি একটি সাময়িক সুরক্ষা বলয় হিসেবে কাজ করছে, তবে বন্দর সক্ষমতার সীমা, লোহিত সাগরের ঝুঁকি ও পরিশোধিত জ্বালানির ঘাটতির মতো চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে — ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ পুনরায় স্থিতিশীল করাটা সহজ কাজ নয়।

পোস্টটি শেয়ার করুন