বুধবার, ১১ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৬শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত: অর্থনীতিতে চাপ বাড়ার আশঙ্কায় ডিসিসিআইয়ের সতর্কতা

যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের সংলগ্ন সংঘাত বাড়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, সমুদ্রপথ ও আর্থিক ব্যবস্থায় তীব্র অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে—এই উদ্বেগ জানিয়েছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। সংস্থার সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও সামুদ্রিক বাণিজ্যে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটাতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল বিশ্বের অপরিশোধিত তেল ও এলএনজি সরবরাহের অন্যতম কেন্দ্র হওয়ায় সরবরাহে বিঘ্নের আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে; কিছু সময় ধরে কাঁচা তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ মার্কিন ডলারের উর্ধ্বে অবস্থান করছে। ডিসিসিআইয়ের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বিশ্ববাজারে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১০ মার্কিন ডলার বাড়লে বাংলাদেশের মাসিক আমদানি ব্যয় প্রায় ৭০–৮০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে, যা বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বাড়িয়ে বাণিজ্য ঘাটতি তীব্র করতে পারে।

আরেকটি উদ্বেগ হলো হরমুজ প্রণালী কেন্দ্রিক ঝুঁকি। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ দিয়ে বয়ে যায়; এই রুটে দীর্ঘমেয়াদি বিঘ্ন হলে নৌপরিবহন খরচ, বীমা প্রিমিয়াম ও ফ্রেইট চার্জ বেড়ে যাবে এবং পণ্য সরবরাহে বিলম্ব দেখা দেবে।

বিশেষত রফতানিমুখী শিল্পখাত—বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত—এই পরিস্থিতিতে বেশি সংবেদনশীল। লজিস্টিক ব্যয় বাড়া, কাঁচামালের সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন এবং সমুদ্রপথে পরিবহনের ঝুঁকি হলে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সংগঠনটি আরও উল্লেখ করেছে যে, স্থানীয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে গত সাত মাসে রফতানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, যা বর্তমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সাথে যুক্ত হয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে।

যদিও ঝুঁকি উচ্চ, তৎকালীন কিছু ইতিবাচক ইঙ্গিতও দেখা যাচ্ছে—সম্প্রতি এলএনজি, এলপিজি ও ডিজেল পরিবহনের উদ্দেশ্যে ১০টির বেশি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে প্রবেশ করেছে, যা স্বল্পমেয়াদে দেশের জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করবে। তবু ডিসিসিআই বলে দিচ্ছে যে সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত অনিশ্চিত এবং সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী বা ভূগোলগতভাবে আরও বিস্তৃত হলে দেশের অর্থনীতিতে বড় সামষ্টিক চাপ তৈরি হতে পারে।

সম্ভাব্য প্রভাবগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য: জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়ে চাপ বাড়ার ফলে মূল্যস্ফীতি ত্বরান্বিত হওয়া, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রবাসীদের রেমিট্যান্স প্রবাহে সম্ভাব্য বিঘ্ন।

এই পরিস্থিতিতে ডিসিসিআই সরকারকে আগাম ও কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানিয়েছে। তাদের সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে কৌশলগত জ্বালানি মজুত বাড়ানো, জ্বালানি আমদানের উৎস বহুমুখীকরণ, সরবরাহ শৃঙ্খলের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং সরকার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় জোরদার করা। পাশাপাশি বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করাও সংগঠনের অন্যতম আবেদন।

ডিসিসিআই’র মত হলো—দীর্ঘস্থায়ী ভূরাজনৈতিক সংঘাত শুধু বৈশ্বিক বাণিজ্যকেই না ধরেই বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের মাক্রো-অর্থনীতিক স্থিতিশীলতাকেও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে। তাই সময়োপযোগী নীতিগত প্রস্তুতি এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা নেয়া এখন জরুরি।

পোস্টটি শেয়ার করুন