লিবিয়ায় মানবপাচারকারীদের নির্যাতনে মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার তছির ফকির (৩৫) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। বুধবার (১৩ মে) এই মৃত্যুর খবর পেয়ে মৃতের পরিবার ও এলাকাবাসী শোকস্তব্ধ হয়ে পড়েছে।
নিহত তছির রাজৈর উপজেলার ঘোষালকান্দি গ্রামের কালু ফকিরের ছেলে। পরিবারের বিবরণ অনুযায়ী, টেকেরহাট বন্দরের বাস কাউন্টার এলাকায় চায়ের দোকান চালিয়ে স্ত্রী, বাবা-মা ও ৩ মেয়েসহ মোট ৭ সদস্যের সংসার চালাতেন তিনি। পরিবারে আর্থিক অবস্থার উন্নতির আশায় তছির ইউরোপ যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন।
প্রতিবেশী পূর্ব স্বরমঙ্গল গ্রামের মানবপাচারকারী দালাল রফিকুল ইসলাম (বাঘা) এক মাসের মধ্যে ইতালি পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে প্রথমে চুক্তি অনুযায়ী সুদ ও জমি বিক্রি করে আনানো ২৫ লাখ টাকা তার হাতে নেয় বলে পরিবার জানায়। আট মাস আগে তছির বাড়ি থেকে প্রস্থান করে। পরে তাকে লিবিয়ায় পাঠানো হয়।
লিবিয়ায় পৌঁছে মাফিয়া ও দালালচক্র তছিরকে বন্দিশালায় আটকে রেখে নির্যাতন করে এবং পরিবারের কাছ থেকে আরও ২০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়। নির্যাতনে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে লিবিয়ার একটি হাসপাতালে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। তারপর চিকিৎসার জন্য দাবি করে দালালচক্র আরও ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা নিয়েছে।
পরিবারের তথ্যে, মোট কয়েক দফায় ৪৮ লাখ টাকা এই দালাল চক্র তছিরের কাছ থেকে হাতিয়েছে। একপর্যায় তছিরের মরদেহ গুম করার চেষ্টা চালায় মানবপাচারকারীরা; বন্দিশালায় (গেম ঘরে) রেখে পরে আবার ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে ইতালি পাঠানোর নাম করে ১৪ লাখ টাকা দাবি করে তারা।
গত মঙ্গলবার রাতে লিবিয়ায় থাকা কিছু বাংলাদেশি সহচর তছিরের মৃত্যুর খবর তার পরিবারের কাছে পৌঁছে দেয়। খবর পেয়ে নিহতের স্বজনেরা কান্নায় ভেঙে পরেন এবং ক্ষোভে ভরা দাবি জানান—লাশ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে হবে এবং দালালদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কড়া শাস্তি হতে হবে। খবর পেয়ে দালাল রফিকুল ইসলাম ও তার পরিবারের সদস্যরা পালিয়ে গেছে বলে পরিবার দাবি করেছে।
নিহত তছিরের স্ত্রী ইসমোতারা বেগম কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, ‘জায়গা-জমি বিক্রি করেছি, আত্মীয়-স্বজন ও বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা ধার করে দালালের হাতে দিয়েছি। ৪৮ লাখ টাকা নেয়া হয়েছে, কিন্তু আমার স্বামীকে মারধর করে মেরে ফেলেছে। अब আমার কী হবে, কীভাবে দেনা পরিশোধ করব, মেয়েগুলো নিয়ে কীভাবে বাঁচব—সব শেষ হয়ে গেছে। সরকারের কাছে আমি চাই, আমার স্বামীর লাশ যেন দেশে ফিরিয়ে আনে।’
নিহতের ছোট ভাই শাহীন ফকির বলেন, ‘মৃত্যুর খবর পেয়ে রফিকুলের বাড়িতে গেলে কাউকে পাইনি, তারা আগেই পালিয়ে গেছে। আমার ভাইকে শেষবারের মতো একবার দেখতে চাই। লাশ দেশে আনার ব্যবস্থা করুন এবং দালালদের সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে হবে।’
বাবা কালু ফকির আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, ‘এই বয়সে আমার ছেলের কবরের মাটি দেয়ার কথা হত, কিন্তু নিজে চলে গেল—আমার ছেলেটাকে দেশে ফিরিয়ে দিন, অন্তত তার মুখটা দেখতে চাই।’ তিনি আরও কোনো দাবী না রেখে কেবল লাশ ফেরত আনার অনুরোধ করেন।
রাজৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহফুজুল হক জানান, লিবিয়ায় এক যুবকের নির্যাতনে মৃত্যুর খবর তারা জানেন, তবে এখনও পরিবার থেকে লিখিত কোনও আবেদন পাওয়া যায়নি। আবেদন পেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে লাশ দেশে আনার চেষ্টা করা হবে। তিনি বলেন, দালালদের বিরুদ্ধে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার পক্ষ থেকে সবাইকে অনুরোধ করা হয়েছে—জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা থেকে বিরত থাকুন। বৈধ প্রক্রিয়া ও প্রশিক্ষণ নিয়ে বিদেশ যাওয়াই নিরাপদ এবং তা দেশ-পরিবারের জন্য উপকারি হবে।
এ ঘটনায় পরিবার ও স্থানীয়রা দালাল চক্রকে দ্রুত দণ্ডিত করার দাবি জানিয়ে চলমান অনুসন্ধান ও লাশ প্রদেশে ফেরত আনার দ্রুত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছেন।