দীর্ঘদিন ধরে চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে দেশবাসী কষ্টে থাকতেই নতুন করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি জনজীবনে আরও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেই সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এক বিশাল জাতীয় বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে। বর্তমান সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট হিসাবেই ধরে নেওয়া হয়ার কারণে প্রত্যাশাও বেশি, কিন্তু বাস্তবতা অনেকাংশেই জটিল ও চ্যালেঞ্জিং। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এবারের বাজেট কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের পথে বড় তিনটি বাধা থাকবে — লাগামছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিশাল বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ ঋণ পরিশোধের চাপ সামলানো এবং মন্থর অর্থনীতিকে পুনরায় গতিতে আনা।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক তথ্যও দেশের অর্থনৈতিক দিকটাকে উদ্বেগজনক করে তুলেছে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৭১ শতাংশ, আর মাত্র এক মাসের ব্যবধানে এপ্রিলে তা বেড়ে ৯.০৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সরকার আগামী অর্থবছরের জন্য মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনা—কিন্তু চলতি পরিসংখ্যান ও বিশ্ববাজারের অনিশ্চয়তা সেই লক্ষ্য অর্জনকে কঠিন করে তুলছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ওঠা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও টাকার ডলারের বিপরীতে অবমূল্যায়ন আমদানি ব্যয় বাড়িয়েছে; তার ফল local বাজারে সরাসরি ছড়িয়ে পড়ছে।
অর্থনীতিবিদদের ভাষায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়া কেবল এক খাতে প্রভাব রেখে যায় না—এটি সমগ্র অর্থনীতিতে এক প্রকার চেইন রিঅ্যাকশন সৃষ্টি করে। জ্বালানি খরচ বেড়ালে কৃষি উৎপাদন, শিল্প কারখানা, পরিবহন খরচ, পণ্য বিপণন ও সেবাখাতের খরচ সবই বাড়ে। উৎপাদক ও সরবরাহকারীরা বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপরই চাপিয়ে দেয়, ফলে বাজারে প্রতিটি পণ্যের মূল্য আবারও বাড়ে এবং মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয় শ্রেণির মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্পখাতের উৎপাদন সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান দুর্বল হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। স্থানীয় উৎপাদন খরচ বাড়লে অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রতিযোগিতা কমে এবং রপ্তানি ক্ষেত্রেও দেশের ব্যবসায়ীদের প্রতিযোগিতা হারানোর সম্ভাবনা বাড়ে। পরিবহন খাতের ব্যয় বাড়লে নিত্যপণ্যের সরবরাহে অনিশ্চয়তা বাড়ে এবং বাজার আরও অস্থিতিশীল হয়। সেচ ও কৃষিতে ব্যবহৃত জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, যা পরোক্ষভাবে দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে বসায়। সব মিলিয়ে এই পরিস্থিতি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্যহ্রাসের লক্ষ্যকেও ব্যাহত করছে।
বাজেট ঘোষণার আগে সরকারকে এই বাস্তবতার মুখে নীতিনির্ধারণে খুব সতর্ক হওয়া দরকার। একদিকে উন্নয়ন কর্মসূচি চালিয়ে রাখার দাবি আছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ভোগবিলাস ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতেও চাপ বাড়ছে। আসন্ন বাজেটে কি করে দরিদ্র ও মাঝারি আয়ের মানুষকে রক্ষা করা হবে, রাজস্ব সংগ্রহ ও ব্যয়ের ভারসাম্য কীভাবে রাখা হবে—এসবই এখন বড় প্রশ্ন। বিশ্লেষকদের মতে, কার্যকর কৃচ্ছ্রসাধন, লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি ও সঠিক রাজস্ব নীতি পাশাপাশি গ্রহণ না করলে এই সংকট থেকে উত্তরণ কঠিন হবে। সরকার ও নীতিনির্ধারকদের সামনে এখন দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলকরণ পরিকল্পনা আনতেই হবে।