বৃহস্পতিবার, ১৮ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৪ঠা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী: সীমান্তে বিএসএফের হত্যাকা-মানবাধিকার লঙ্ঘন

জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক নিরীহ বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যার বিষয়কে অত্যন্ত দুঃখজনক হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, এটি মানবাধিকারের স্পষ্ট লঙ্ঘন। তিনি বলেন, বিষয়টি বারবার উত্থাপন করা হয়েছে এবং দুই দেশের উচ্চ পর্যায়ের সীমান্ত আলোচনায় যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বুধবার (১৭ জুন) স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে শুরু হওয়া সংসদে সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনির প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি জানান, বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ে অনুষ্ঠিত সীমান্ত সম্মেলনগুলোতেই বাংলাদেশ বারবার এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে ক্ষতিপূরণ, জবাবদিহি ও ধারাবাহিক তদন্তের দাবি জানিয়েছে। যদিও নিহতদের পরিবারের প্রতি সরাসরি আর্থিক সহায়তা সংক্রান্ত কোন প্রাতিষ্ঠানিক চুক্তি ভারত সরকারের পক্ষ থেকে গৃহীত হয়নি।

মন্ত্রী আরও বলেন, সীমান্তে যে কোন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে পরিস্থিতি শান্ত করার কার্যকর ব্যবস্থায় বিশ্বাসযোগ্য প্রচেষ্টা চালু রয়েছে। তিনি বঙ্গবন্ধু সশস্ত্র সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি) ও বিএসএফের মধ্যে স্থায়ী যোগাযোগ ব্যবস্থার গুরুত্বও স্মরণ করান।

সংসদে তিনি সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল মালিকের প্রশ্নের জবাবে সীমান্ত সংক্রান্ত কিছু পরিসংখ্যানও তুলে ধরেন। তিনি জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত বিএসএফের পুশ ইন করা ২,৩৬৯ জনের মধ্যে ২,১৭৫ জনকে সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে, ১১ জনকে বিএসএফের কাছে ফেরত দেয়া হয়েছে এবং ১৮৩ জনকে পুশব্যাক করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের পর বিএসএফের ৩৬টি পুশ ইন চেষ্টাকে বিজিবি সফলভাবে প্রতিরোধ করেছে, বলেও তিনি অভিব্যক্তি দেন।

সীমান্তে অপরাধ ঠেকাতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ‘বর্ডার কমিউনিটি ওয়াচ গ্রুপ’ গঠন করা হয়েছে বলে মন্ত্রী জানান। এছাড়া মিয়ানমার সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার ও আন্তসীমান্ত অপরাধ দমন мақсат নিয়ে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে; ভারতের সীমান্তের স্পর্শকাতর কিছু এলাকায়ও কাঁটাতারের বেড়া বসানোর পরিকল্পনা বিবেচনাধীন রয়েছে।

মাদকদ্রব্যের বিরুদ্ধে অভিযানেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় ফলাফল এসেছে—সংরক্ষিত আসনের নিপুন রায় চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গত এক বছরে (জুন ২০২৫ থেকে মে ২০২৬) সীমান্ত এলাকায় বিজিবির ৩,৭৫,৫১৯টি অভিযানে প্রায় ১ হাজার ৯৭৯ কোটি ৫৩ লাখ টাকা মূল্যের চোরাচালানি মালপত্র এবং বিপুল পরিমাণ ইয়াবা, ফেনসিডিল, ক্রিস্টাল মেথ, কোকেনসহ মাদকজব্দ করা হয়েছে; এ অভিযানে ২,১৮৯ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

দেশের অভ্যন্তরে মাদকবিরোধী কার্যক্রম প্রসঙ্গে কুমিল্লা-৯ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবুল কালামের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী আইস বা ক্রিস্টাল মেথের আসক্তি বাড়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। তিনি জানান, মাদক নির্মূল অভিযানে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত দেশব্যাপী ৩০,৭৪৪টি অভিযানে ৯,৬৮৫ জন মাদক চোরাকারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া বিশেষ নির্দেশনায় ১ মে থেকে ৮ জুন পর্যন্ত চলমান মাদক ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে ১০,৮৬৫ জনকে গ্রেপ্তার এবং ১২৫টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়েছে।

রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, কিশোর গ্যাংসহ সাইবার মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধ তদারকিতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সাইবার ইউনিট তাদের ফেসবুক পেজ, গোপন গ্রুপ ও টিকটক আইডি সার্বিকভাবে মনিটর করছে। মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে ২৫২ জন ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তিনি যোগ করেন।

কারাগারের পরিস্থিতি সম্পর্কে মন্ত্রী কুমিল্লা-৪ আসনের সদস্যের প্রশ্নের জবাবে বলেন, দেশের ৭৫টি কারাগারের ধারণক্ষমতা ৪৫,১৩৬ জন হলেও বর্তমানে সেখানকার বন্দিদের সংখ্যা ৭৭,০৪০ জন, যা ধারণক্ষমতার প্রায় ১.৭ গুণ। তবে তিনি একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের কথাও তুলে ধরেন—কারাবন্দীদের উৎপাদিত সামগ্রীর বিক্রয়লভ্য অর্থের ৫০ শতাংশ এখন বন্দীদের দেওয়া হচ্ছে।

অনলাইন জুয়া ও বেটিং রোধে পুলিশ, বিটিআরসি ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে বলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন। যুবসমাজকে এর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করতে সরকার ‘বঙ্গীয় প্রকাশ্য জুয়া আইন, ১৮৬৭’ বাতিল করে আরও কড়া এবং যুগোপযোগী ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’ প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, তিনি সংবিধিবদ্ধ করেন।

সদরের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশের নিরাপত্তা, সীমান্ত পরিচালনা ও মাদক বিরোধী অভিযানে সরকারের অঙ্গীকার ও অগ্রগতির বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন এবং জনগণের নিরাপত্তা ও মানবাধিকার রক্ষায় তিনি চলমান পদক্ষেপগুলোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।

পোস্টটি শেয়ার করুন