চট্টগ্রাম বন্দরের পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। টার্মিনালটি পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সৌদি আরবভিত্তিক রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল (আরএসজিটি) জানায়, প্রায় ৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (৩০০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের) চারটি অত্যাধুনিক শিপ-টু-শোর (এসটিএস) ক্রেন পৌঁছানোর পর আগামী জুলাই ২০২৬ থেকে টার্মিনালটি পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করবে।
বন্দর কর্তৃপক্ষ চট্টগ্রাম (সিপিএ) এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, এই ক্রেনগুলো নিয়ে জাহাজ ‘এম.ভি. ল্যান হাই হং ইউন’ টার্মিনালের ভেড়ার অপেক্ষায় রয়েছে। নিরাপদ খালাস কার্যক্রম নিশ্চিত করতে সিপিএ নিষেধাজ্ঞা জারি করে টার্মিনালের আশপাশে চলাচলকারী সব ধরনের নৌযান—কোস্টার, ট্যাঙ্কার, মাছ ধরার ট্রলার ও অন্যান্য জাহাজকে জেটি থেকে অন্তত ১০০ মিটার দূরত্ব বজায় রাখতে বলেছে। পাশাপাশি কর্ণফুলী চ্যানেলের পূর্ব পাশে দিয়ে চলাচলের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
চীনের স্যানি মেরিন হেভি ইন্ডাস্ট্রি উৎপাদিত ওই চারটি ক্রেন টার্মিনালের জাহাজ‑হ্যান্ডলিং ক্ষমতা ও কনটেইনার ওঠানো‑নামানোর গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। আরএসজিটি 지난해 ২৬ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ১৪টি রাবার টায়ার গ্যান্ট্রি (আরটিজি) ক্রেনও সংগ্রহ করেছিল।
আরএসজিটি বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ও জনসংযোগ প্রধান সৈয়দ আরিফ সারোয়ার বলেন, “এই ক্রেনগুলো টার্মিনালের জন্য একটি বড় প্রযুক্তিগত মাইলফলক। এগুলো আমাদের বাড়তে থাকা কনটেইনার ট্রাফিক সামলানোর সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করবে।”
নতুন এসটিএস ক্রেনগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যে এগুলো ১৬ সারি কনটেইনার বিশিষ্ট বড় জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ে সক্ষম—এটি বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরেই বেশি দেখা যায় এমন ১২–১৩ সারির জাহাজের থেকে অনেক বড়। একজন ক্রেন একক কনটেইনার অপারেশনে ৪০ টন, টুইন‑লিফট মোডে ৪৫ টন এবং বিশেষায়িত কার্গোর ক্ষেত্রে ৬০ টন পর্যন্ত ওজন তুলতে পারবে। ক্রেনগুলো চট্টগ্রাম বন্দরের উচ্চতা সীমাবদ্ধতা মাথায় রেখে নির্মিত হয়েছে।
পরিবেশগত দিক থেকে এগুলো সম্পূর্ণভাবে বিদ্যুৎচালিত হওয়ায় কার্বন নির্গমন কমবে এবং জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে বলে আরএসজিটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। রেল ট্র্যাকে বসানো থাকায় একই সময়ে দুটি জাহাজে কাজ করা যাবে, ফলে জাহাজ জেটিতে ভেড়ার পর দ্রুত খালাস শুরু করে ৩–৪ দিনের মধ্যে কাজ শেষ করা সহজ হবে।
পারফরম্যান্স ও সক্ষমতা বিষয়ে বলতে গিয়ে সারোয়ার বলেন, “আমরা ইজারা চুক্তির প্রথম দুই বছর অবকাঠামো উন্নয়ন ও যন্ত্রপাতি সংগ্রহে বিনিয়োগ করেছি, যাতে আগামী ২০ বছর টার্মিনালটি পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারে।” তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন এসটিএস ক্রেনগুলো যুক্ত হওয়ার ফলে টার্মিনাল ২০২৬ সালের জুলাই থেকে উচ্চ কার্যক্ষমতায় পৌঁছাবে।
টিপণ্যগত পারফরম্যান্স নির্দেশক হিসেবে বলা হয়েছে, পতেঙ্গা টার্মিনালের বার্ষিক কনটেইনার হ্যান্ডলিং ক্ষমতা প্রায় ৪৫০,০০০ টিইইউ। তবে ২০২৫ সালে এখানে কেবল ১৫৪,৫৬৪ টিইইউ কনটেইনার ও ৭৮টি জাহাজ হ্যান্ডেল করা হয়েছে—যার মধ্যে রপ্তানি ৯৩,৩৪০ টিইইউ ও আমদানি ৬১,২২৪ টিইইউ। ২০২৫ সালের শুরুর দিকে আমদানি কনটেইনার পরীক্ষায় প্রয়োজনীয় স্ক্যানার না থাকার কারণে কাজে কিছুটা ধীরগতি দেখা দেয়; পরে মে মাসে আরএসজিটি নিজ অর্থায়নে ৩ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে স্ক্যানার স্থাপন করলে কার্যক্রমের গতি বাড়ে। এর ফলেই গত বছরের আগস্ট মাসে টার্মিনাল রেকর্ড ২৪,৫৯৯ টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডেল করতে সক্ষম হয়।
উল্লেখ্য, পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল ২২ বছরের ইজারা চুক্তিতে ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে আরএসজিটির কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং তারা ২০২৪ সালের জুন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করে। নির্ধারিত যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো পৌঁছে গেলে টার্মিনালের সার্বিক ক্ষমতা ও খালাস গতিই ফেরত পাবে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।