মধ্যপ্রাচ্য—চিরপুরাতন অস্থিরতা, যুদ্ধ ও অনিশ্চয়তার এক ছবি। তবে যাতায়াতে যুদ্ধের দায় শুধুই স্থানীয় মানুষের নয়; সেখানে পেছনেHistory-এ গোপন সিদ্ধান্ত, পরাশক্তিদের ভূ-রাজনীতিক স্বার্থও বড় ভূমিকা রেখেছে। গত একশো বছরের নীতিগত বিচ্যুতি এবং আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো অনেকবার ‘শান্তি’ বলে এসেছে, কিন্তু বাস্তবে বহু ক্ষেত্রে তা নতুন সংকটের বীজ ছড়িয়েছে।
ইতিহাসের এই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের জুনে আবার এক নাটকীয় অধ্যায় দেখা দিয়েছে। সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টকে শুক্রবার (১৯ জুন) আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে নির্ধারিত শান্তি আলোচনা শেষ মুহূর্তে স্থগিত করা হয়েছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে.ডি. ভ্যান্সের সফর বাতিল হওয়ায় বৈঠকটি আর হচ্ছেনা—যা অঞ্চলটিতে শান্তির ভবিষ্যৎকে নতুন অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
এদিকে কূটকৌশলগত মেলায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্বরক থাকলেও, একই সময়ে লেবাননে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। দেশটির জাতীয় সংবাদ সংস্থা এনএনএ জানিয়েছে, শুক্রবারের আক্রমণে অন্তত ১৮ জন নিহত হয়েছেন; এ ছাড়াও অস্বীকৃত সংখ্যা আহত ও নিখোঁজ রয়েছে—আলজাজিরা এ খবর জানিয়েছে। এনএনএ বলেছে, রাতের হামলাগুলো অঞ্চলটিতে সাম্প্রতিককালের সবচেয়ে তীব্র আক্রমণের মধ্যে পড়ে এবং একাধিক আবাসিক ভবন লক্ষ্য করা হয়েছে।
গাজা ভূখণ্ডে গত অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি সই করলেও ইসরায়েলের নির্বিচারে হামলা থামেনি; নিহতের সংখ্যা তখন থেকেই হাজার ছাড়িয়ে গেছে। চিকিৎসা সাহায্যকারীদের বক্তব্য—গাজার মানুষরা এখনও প্রতিদিন প্রিয়জনদের দাফন করছে, এবং চুক্তি শুধুমাত্র বড় আকারের যুদ্ধ ঠেকালেও চুক্তির দ্বিতীয়—সবচেয়ে সংবেদনশীল—পর্যায় বাস্তবায়ন হয়নি। ওই পর্বে ইসরায়েলি সেনাদের প্রত্যাহার ও হামাসের অস্ত্র সমর্পণ অংশ হওয়ার কথা ছিল, যা এখনো সমাধান হয়নি।
ইরানবিরোধী অগ্রযাত্রার সময় উইন্ডোতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানেও নাটকীয় পরিবর্তন দেখা গেছে। গত ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ ইরানবিরোধী আকাশ হামলার পর চার মাসে লড়াইয়ে হাজারেরoxi প্রাণহানি, তেলের দামে ওঠানামা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়েছে—রিপন করে বলা যায়, সংঘাতটি ভয়াবহ ক্ষতি করেছে। শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সাজানো সুইস বৈঠক স্থগিত হলে হোয়াইট হাউস বলেছে, আয়োজন ও ব্যবস্থাপনা কখনোই সহজ ছিল না। তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, ইরান আলোচনায় বসার আগে অন্তর্বর্তী ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নে স্পষ্ট পদক্ষেপ দেখতে চেয়েছিল।
সমঝোতা স্মারক নিয়ে সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলো—অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ, ইরানের বহুজনসম্পদ অবমুক্তকরণ (প্রায় ১০ হাজার কোটি ডলারের বেশি বলে উল্লখ্য), এবং তিন হাজার কোটি ডলার পর্যায়ের পুনর্গঠন তহবিল—এসবই প্রতিকূল প্রসঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুদ্ধ শুরুর সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর ভাষ্য ‘‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ছাড়া চুক্তি নয়’’—কিন্তু পরে বাস্তবতায় তিনি অনেক শর্ত শিথিল করেছেন বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বোঝাচ্ছেন। এই নরম হওয়া অবস্থান নিয়ে রিপাবলিকান শিবিরের মধ্যেও তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, রেজিম পরিবর্তনকে লক্ষ করলে ট্রাম্পের প্রথম ঘোষণাগুলো অনেকটা পেছনে সরে এসেছে। গতি বদলের সবচেয়ে দৃশ্যমান দিক—বর্তমান চুক্তিতে ক্ষেপণাস্ত্র বিষয়ে সরাসরি সীমাবদ্ধতা নেই; ইউরেনিয়াম সম্পর্কে অংশগত ছাড় দেওয়া হয়েছে এবং দ্রুত সময়ে পরিমাণ সীমাবদ্ধ রেখে বেসামরিক জন্য কিছু সমৃদ্ধকরণ অনুমোদন পাওয়া গেছে। সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে আইএইএর তত্ত্বাবধানে স্থানীয়েই নিষ্ক্রিয়করণ বা মিশ্রণের সিদ্ধান্তও নেয়া হয়েছে—অর্থাৎ সম্পূর্ণ কড়া নিয়ন্ত্রণ না করে আপোসহীনভাবে কিছু দায়ভার আইএএএর হাতে রাখা হয়েছে।
এলাকার আঞ্চলিক প্রভাবশালী সংগঠনগুলো—হিজবুল্লাহ ও হামাস—নিয়ে বর্তমান সমঝোতায় সরাসরি আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। হরমুজ প্রণালী ‘স্থায়ীভাবে টোলমুক্ত’ রাখার দাবিও চুক্তিতে দীর্ঘমেয়াদি নয়; কেবল ৬০ দিনের জন্য বাণিজ্যিক নৌযান নিরাপদে চলাচলের কথা বলা হয়েছে। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালী তাদের সার্বভৌম অধিকার এবং তারা চাইলে তদসংশ্লিষ্ট ফি ধার্য করবে।
এই সব কূটনৈতিক নিয়ন্ত্রণ আর অবস্থানগত ছাড়ের মধ্যেই ইসরায়েল নিজ সিদ্ধান্তে অনড় থেকেছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান প্রক্রিয়ার বাইরে রেখে ইসরায়েল লেবাননে হামলা ও সৈন্য স্থিতি বজায় রেখেছে; নতুন মানচিত্র প্রকাশ করে দখলকৃত অঞ্চলের পরিধি বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। এ কারণে আমেরিকা-ইসরায়েল সম্পর্কেও ফাটল দেখা গেছে—ট্রাম্পের পক্ষ থেকে ইসরায়েলের সমালোচনাও সামনে এসেছে।
جنوبية লেবাননেও সংঘাত থামেনি; শুক্রবার সকালে হিজবুল্লাহর হামলায় চার ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছেন—তাদের একজন ছিলেন ৩২ বছর বয়সী লেফটেন্যান্ট ডর গেদালিয়া। ঘটনার পর ইসরায়েলের কড়া ডানপন্থী নিরাপত্তামন্ত্রী এবং অন্যান্য নেতারা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে লেবাননকে ব্যাপক বিধ্বংসের হুমকি দিয়েছেন। এ প্রচণ্ড উত্তেজনা ও মিলিটারি হুমকি লেবাননের প্রায় লাখ লাখ বাসিন্দাকে গৃহহীন করেছে।
বস্তুনিষ্ঠভাবে বলা যায়—মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আনতে গেলে কেবল বাহ্যিক ক্ষমির বা স্টেকহোল্ডারদের স্বার্থের উপর ভিত্তি করে চুক্তি করে করা যাবে না। সাইকস-পিকো থেকে বেলফোর, ক্যাম্প ডেভিড থেকে আব্রাহাম অ্যাকর্ডস এবং অসলো—এই সব সিদ্ধান্তের ইতিহাসই দেখায় যে, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অনুভূতি ও ন্যায়ের বিষয়গুলো উপেক্ষা করলে তা দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা এনে দিতে পারেনি। কোথাও কৃত্রিম সীমান্ত, কোথাও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, কোথাও অনাবশ্যক স্বাধীনতা কাটা—এসব মিলেমিশে আজকের বিভাজন ও সংঘাতের মেরুকরণ তৈরি করেছে।
১৯ জুনের বৈঠক স্থগিত হওয়া এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার উপরই ইসরায়েল ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিক্রিয়া-মিশ্র প্রতিটি ঘটনার মধ্যে সত্যটি স্পষ্ট করে—জতক্ষণ না স্থানীয় মানুষের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ভূখণ্ডগত অধিকারকে কেন্দ্র করে বাস্তব সমঝোতা আসবে, ততক্ষণ ‘শান্তি’ বলে তৈরিকৃত কাগজগুলোই নতুন ধরনের সংঘাতের উৎস হয়ে থাকবে। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে সত্যিকার শান্তির সূর্য এখনো অনেক দূরে।