সোমবার, ২২শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৮ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জাহাজ ভাঙায় আধিপত্য ধরে রেখেছে বাংলাদেশ — অর্থনৈতিক গুরুত্ব বাড়ছে

বিশ্ব জাহাজ পুনর্ব্যবহার (শিপ রিসাইক্লিং) শিল্পে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ইয়ার্ডগুলো দেশীয় ইস্পাত শিল্পকে কাঁচামাল যোগান দেয়ার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় শিল্পায়নের গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (ইউএনসিটিএডি) ও বিভিন্ন শিল্প সূত্রের হিসাব মতে বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় বিশ্বের শীর্ষ পুনর্ব্যবহারকারী দেশের মধ্যে ছিল—তবে ২০২৫ সালে সাময়িকভাবে শীর্ষস্থান ভারতের কাছে চলে যায়।

পরিসংখ্যান ও অর্থনৈতিক প্রভাব

শিল্পমহলের দাবি অনুযায়ী দেশের জাহাজ ভাঙা ও পুনর্ব্যবহার খাত বর্তমানে বছরে প্রায় ২.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি করছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ প্রায় ২.৭৪ মিলিয়ন গ্রস টন জাহাজ পুনর্ব্যবহার করেছে, যা তখনকার বৈশ্বিক বাজারের প্রায় ৪৩ শতাংশের সমান। ২০২৪ সালে ভাঙা বাল্ক ক্যারিয়ারের ৬৭ শতাংশ, গ্যাসবাহী জাহাজের ৫৮ শতাংশ এবং তেলবাহী ট্যাংকারের ৪২ শতাংশ পুনর্ব্যবহার হয়েছে বাংলাদেশে।

তবে ২০২৫ সালে গতানুগতিক গতিতে কিছু ওঠানামা দেখা গেছে। এনজিও শিপব্রেকিং প্ল্যাটফর্ম (NSP) জানায়, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ মাত্র ৮৮টি স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি করেছে (প্রায় ২.৬৮ মিলিয়ন টন), যা ২০২৪ সালের ১৩০টি জাহাজের তুলনায় প্রায় ৩২% কম। এ কারণে ২০২৫ সালে ভারতের অবস্থান সাময়িকভাবে শীর্ষে উঠে আসে; তবু পরিমাণের দিক থেকে ভারতের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান রয়েছে। বিশ্ববাজারে ভারতের, পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে তীক্ষ্ণ প্রতিযোগিতা চলছে।

সীতাকুণ্ড: দেশের প্রধান শিল্পকেন্দ্র

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলজুড়ে শতাধিক জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ড গড়ে উঠেছে। প্রতিবছর বিশ্বের নানা দেশে থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ জাহাজ এখানে আনা হয়। এসব জাহাজ ভাঙে পাওয়া ইস্পাত, যন্ত্রাংশ, পাইপ, কেবল ও অন্যান্য উপকরণ দেশি ওপেন মার্কেট ও বিভিন্ন শিল্পে পুনরায় ব্যবহার করা হয়। শিল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের ইস্পাত শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালের প্রায় ৬০ শতাংশ জাহাজ পুনর্ব্যবহার খাত থেকে আসে, ফলে নির্মাণ খাতের খরচ কমাতে এই শিল্পের অবদান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

কর্মসংস্থান ও রাজস্ব

জাহাজ ভাঙা শিল্পে সরাসরি প্রায় দুই লাখ শ্রমিক কাজ করেন। তদুপরি পরিবহন, অক্সিজেন সরবরাহ, যন্ত্রাংশ ব্যবসা, রি-রোলিং মিল ইত্যাদি খাতে আরও প্রায় ১০ লক্ষেরও বেশি মানুষের livelihoods এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। সরকারও এই খাত থেকে প্রতি বছর আমদানি শুল্ক, কর ও অন্যান্য ফি বাবদ কোটি কোটি টাকা রাজস্ব পান।

সবুজ রূপান্তর ও নিয়মনীতি

আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) ‘হংকং কনভেনশন’ কার্যকর হওয়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ জাহাজ পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থার দিকে ধাপে ধাপে এগোচ্ছে। ইতোমধ্যে দেশীয় ১৭টি জাহাজ পুনর্ব্যবহার ইয়ার্ড আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণে স্বীকৃতি অর্জন করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে অননুমোদিত বা পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ ইয়ার্ডগুলোর বিরুদ্ধে কড়া মনোভাব দেখা যাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে সহায়ক হবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।

চ্যালেঞ্জও আছে অনেক

এই সাফল্যের মাঝেও শ্রমিক সুরক্ষা, পরিবেশদূষণ, বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশগত মানদণ্ড মেনে চলা এখনও বড় উদ্বেগের বিষয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরেই এই সব ক্ষেত্রে দ্রুত উন্নয়ন আনার তাগিদ জারি করে আসছে। পাশাপাশি ২০২৪–২০২৫ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, জাহাজ সরবরাহ হ্রাস ও নতুন নিয়ন্ত্রক বাধ্যবাধকতার প্রভাব স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানিতে কিছুটা প্রভাব ফেলেছে।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি গ্রহণ, আধুনিক অবকাঠামো বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণে সক্ষমতা বাড়ালে বাংলাদেশের জাহাজ পুনর্ব্যবহার শিল্প আগামী দশকে আরও বড় অর্থনৈতিক খাতে পরিণত হতে পারে। বিশ্বব্যাপী আর হাজার হাজার পুরোনো জাহাজ পরবর্তী বছরগুলোতে অবসরে যাবে—এগুলোকে দায়শীল ও নিরাপদভাবে পুনর্ব্যবহার করে দেশের কাঁচামাল এবং কর্মসংস্থান আরও বাড়ানো সম্ভব।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিরাপদ এবং পরিবেশবান্ধব পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে এই শিল্প শুধু দেশের ইস্পাত খাত নয়, পুরো জাতীয় অর্থনীতিকেই শক্তিশালী করে তুলবে। তবে তা করতে হলে প্রযুক্তি, নিয়মনীতি, শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ ও পরিবেশগত দায়িত্ববোধ—all এগুলোতে দ্রুত ও যুগোপযোগী পদক্ষেপ নিতে হবে।

পোস্টটি শেয়ার করুন