মঙ্গলবার, ২৩শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৯ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ব্রিটেনে রাজনৈতিক অস্থিরতার মূল কারণ কী?

গত দশকে ব্রিটেনে সাতজন প্রধানমন্ত্রী দেখা গেছে — এমন তথ্যই বোঝায় দেশটিতে রাজনৈতিক অস্থিরতা কতটাই দ্রুত গহ্বর ধরেছে। লন্ডনের 10 ডাউনিং স্ট্রিটের সেই কালো দরজা-যুক্ত সরকারি বাসভবন প্রায় ৩০০ বছর ধরে প্রধানমন্ত্রীদের ঠিকানা; উইনস্টন চার্চিল সেখানে মোট নয় বছর ছিলেন, মার্গারেট থ্যাচার প্রায় ১২ বছর এবং টনি ব্লেয়ার ১৯৯৭–২০০৭ সালের মধ্যে এক দশক সেখানে কাটিয়েছিলেন। তবু শেষ দশকে এই ঐতিহ্যবাহী ঠিকানায় নেতৃত্ব স্থির থাকে না — নতুন নেতা আসার আগেই পুরনোকে বিদায় নিতে হয়। কেন এমন হলো? সমস্যার মূল বোঝার চেষ্টা করাই জরুরি।

কীভাবে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন

যুক্তরাজ্যে ভোটাররা সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করেন না। সাধারণ মানুষ হাউস অব কমন্সে তাদের সাংসদ নির্বাচন করেন; ঐ অংশগ্রহণের ভিত্তিতে যে দলের নেতা সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়, তিনি প্রধানমন্ত্রী হন। কিন্তু বিশ্বের অনেক রাজনৈতিক ব্যবস্থার থেকে এক গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে: পার্টির ভেতরে নেতৃত্ব বদলালে সাধারণ নির্বাচন না হলে ও কোনো সংবিধানিক বাধা নেই — দলের নেতা পালটে এটাই প্রধানমন্ত্রীও বদলে যায়। ফলে যদি দলীয় বিধ্বংসী বা অসন্তুষ্টি বাড়ে, সংসদীর মোর্যাল কমে বা অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দেখা দেয়, প্রধানমন্ত্রীকে সরানো খুবই দ্রুত ঘটতে পারে। আইনত সাধারণ নির্বাচন সর্বোচ্চ পাঁচ বছরে একবার হলেও ক্ষমতাসীন সরকার ইচ্ছা করলে আগেও নির্বাচন দিতে পারে।

ব্রেক্সিট — সবকিছুর শুরু?

২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোট রাজনৈতিক নাটকটির কেবল এক এপিসোডই নয়; সেটা অনেক কিছুর পুনর্গঠন শুরু করেছিল। ডেভিড ক্যামেরনের নেতৃত্বে কনজারভেটিভরা ২০১৫ সালে নির্বাচিত হলে EU সংক্রান্ত গণভোটের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। গণভোটে রিমেইনের পক্ষে প্রচারণা চালানো সত্ত্বেও বিজয় এল ‘লিভ’-এর, এবং ফলাফল প্রকাশের পর ২০১৬ সালের জুলাইয়ে ক্যামেরন পদত্যাগ করেন।

ব্রেক্সিট কনজারভেটিভ পার্টির ভেতরে রাজনৈতিক ভূখণ্ড বদলে দেয় — দীর্ঘদিনের ব্যবসাবান্ধব, ইউরোপপন্থি সমর্থকদের মধ্যে অনেকেই সরতে থাকে এবং জনতাবাদী, ব্রেক্সিট-সক্রিয় প্রার্থীরা প্রাধান্য পায়। একই সময়ে লেবার পার্টিতেও সংকট তৈরি হয় এবং বহু ঐতিহ্যগত সমর্থক বিভক্ত হয়ে পড়ে। সেই বিভাজনই ভবিষ্যতের সহস্রাব্দীয় অস্থিরতার বীজ বোনা শুরু করে।

কোভিড, অর্থনীতি ও কেলেঙ্কারি

ব্রেক্সিটের পরে যে আশ্বাসগুলো দেয়া হয়েছিল—ইমিগ্রেশন কমে, অর্থনীতির উন্নতি, ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসে বরাদ্দ বাড়ানো—সেগুলো বাস্তবে পূরণে কঠিন সময় পড়ল। তার ওপর কোভিড-১৯ মহামারি এবং ইউক্রেন-সহ বিশ্ব সংঘাতের ফলে অর্থনৈতিক চাপ তীব্র হয়। এই চাপের মধ্যে রাজনৈতিক নেতাদের উপর জনসাধারণের توقع ও আস্থা দুইই কাঁপে।

থেরেসা মে’র পতনও ছিল সেই পরিবেশেরই অংশ: ব্রেক্সিট বাস্তবায়নে দলের ভেতরের টানাপোড়েন ও পার্টি নেতৃত্বে অনিশ্চিত অবস্থার ফলে তিনি স্থায়ীভাবে দমিয়ে রাখতে পারেননি। এরপর ২০১৯ সালে দায়িত্ব নেন বরিস জনসন — ‘গেট ব্রেক্সিট ডান’ স্লোগান তাকে ক্ষমতায় নিয়ে আসে। কিন্তু তার শাসনে বারবার বিরোধ ও কেলেঙ্কারি দেখা দেয়; কোভিড বিধি-ভঙ্গের ‘পার্টিগেট’ কাণ্ড, এবং কিছু বিতর্কিত লোককে পদোন্নতি দিয়ে দলীয় ও জনমত নষ্ট হওয়ায় ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি পদত্যাগ করেন।

তারপর অল্প দিনের জন্য ক্ষমতায় এলেন লিজ ট্রাস: তার প্রস্তাবিত ‘মিনি বাজেট’-এ বড় করছাঁটাইয়ের প্রস্তাব আর অর্থের উৎস সম্পর্কে অস্পষ্টতা বাজারে ধাক্কা দেয়, মর্টগেজ সুদসহ আর্থিক অস্থিরতা বাড়ে। মাত্র ৪৫ দিন পর তিনি কেবলি দায়িত্ব ছেড়ে দেন।

ঋষি সুনাকের দায়িত্ব গ্রহণের পরও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি। মহামারি ও বিশ্ববাজারে অস্থিরতার কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সরকারের কাজকর্ম কঠিনতম চ্যালেঞ্জে পড়ে; ভোটারদের দীর্ঘমেয়াদি সমর্থন ধরে রাখা কঠিন হয়ে ওঠে।

কেন বারবার সরকার বদলাচ্ছে?

সংক্ষেপে বলা যায়: (১) পার্টি অভ্যন্তরে নেতা বদলানোর সহজ বিধান, (২) ব্রেক্সিটের পর দলীয় ও সামাজিক বিভাজন, (৩) কোভিড-১৯ ও আন্তর্জাতিক সংঘাতের ফলে অর্থনৈতিক চাপ, (৪) নেতাদের ব্যক্তিগত বা প্রশাসনিক কেলেঙ্কারি— এগুলো মিলেই গত দশকের দ্রুত পরিবর্তনের কারণ। যখন পার্টির আশ্রয়ে থাকা নেতা-চক্রের ভেতর আস্থা কমে, তখন সাধারণ নির্বাচন ছাড়াই নেতৃত্ব দ্রুত বদলে যায়।

ভবিষ্যৎ কেমন হতে পারে?

দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য দুইটি উপায় জরুরি: রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য ও পুনর্গঠন এবং অর্থনীতিতে দৃঢ় নীতি—যা দুষ্প্রাপ্য হলেও ঐক্যই কেবল বড় সংকট সইতে পারে। এখনও ব্রেক্সিটের প্রতিশ্রুতি, মহামারি ও বিশ্বজুড়ে অনিশ্চয়তা দেশটির রাজনৈতিক সংস্কৃতির ওপর ছাপ ফেলছে; তাই সাময়িক অস্হিরতা স্বাভাবিকভাবেই ভবিষ্যতকেও প্রভাবিত করবে।

সংক্ষেপে, ব্রিটেনে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা একক কোনো ঘটনার ফল নয়—এটি দীর্ঘমেয়াদি বিভাজন, আন্তর্জাতিক ও অর্থনৈতিক শক এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মিলিত ফলাফল।

পোস্টটি শেয়ার করুন