শনিবার, ১৮ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩রা শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভারতের নিষেধাজ্ঞায় বেনাপোলের রপ্তানি অর্ধেকে নেমে এসেছে, বাণিজ্য ঘাটির আশঙ্কা

বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের (২০২৪ সালের ৫ আগস্ট) পর থেকে ভারতের আরোপিত বিভিন্ন বিধিনিষেধ এবং শর্তের কারণে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারতে রপ্তানি ব্যাপকভাবে কমেছে। বন্দর ও ব্যবসায়িক সূত্রে দেখা যাচ্ছে, প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও ভারত তাদের একতরফা নিষেধাজ্ঞাগুলো প্রত্যাহার করেনি; ফলে স্থানীয় অর্থনীতি ও রপ্তানি ব্যবসার ওপর তাৎপর্যপূর্ণ নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

বেনাপোল বন্দর কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেনাপোল দিয়ে ভারতে মোট ৩ লাখ ৮১ হাজার ৪৪০ মেট্রিক টন পণ্য রপ্তানি হয়েছিল। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সেই পরিমাণ প্রায় অর্ধেকে নেমে গিয়ে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১ লাখ ৯২ হাজার ৮২ মেট্রিক টনে—অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি কমেছে প্রায় ১ লাখ ৮৯ হাজার ৩৫৮ মেট্রিক টন।

আমদানি ও রপ্তানির এই ভারসাম্যহীনতা প্রতিদিনের ট্রাক চলাচলের পরিসংখ্যানেও প্রতিফলিত হচ্ছে। এক নজিরীয় দিনের উদাহরণ হিসেবে সোমবার ভারতের থেকে বাংলাদেশে ৩০৫টি পণ্যবাহী ট্রাক প্রবেশ করলেও, এর বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে ভারতে রপ্তানি হয়েছিল মাত্র ৪৪টি ট্রাক পণ্য। ব্যবসায়ীদের ধারণা, ভারতের ক্রমাগত আরোপিত শর্ত ও নিষেধাজ্ঞাই দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে এই বড় ধরনের অনুপাতে নেতৃত্ব দিয়েছে।

বন্দর সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ২০২৫ সালের ৮ এপ্রিল থেকে সড়কপথে এবং ভারতের বন্দর/বিমান পথে তৃতীয় দেশে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক পরিবহন বন্ধ করে দেয় ভারত। এরপর ১৫ এপ্রিল সড়কপথে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় এবং ১৭ মে জারি করা একটি আর্থিক/সরকারী প্রজ্ঞাপনে স্থলপথে তৈরি পোশাক, সুতা, প্লাস্টিক, কাঠজাত পণ্য ও ফল-ফলজাত পণ্যের আমদানি-রপ্তানিতে কঠোর বিধিনিষেধ চালু করা হয়। এসব সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় বেনাপোল দিয়ে রফতানি ধীরগতিতে পড়ে গেছে।

বেনাপোলের ব্যবসায়ী নেতারা ভারতের অনমনীয় অবস্থাকে গভীর উদ্বেগজনক বলে আখ্যা দিয়েছেন। বেনাপোল আমদানি-রপ্তানি সমিতির সহসভাপতি আমিনুর হক বলেন, নতুন গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও ভারত এসব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না করায় বেনাপোল দিয়ে রপ্তানি বাণিজ্যে বিশাল ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

বেনাপোল সি অ্যান্ড এফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের দপ্তর সম্পাদক মোস্তাফিজ্জোহা সেলিম জানিয়েছেন, যদি ভারত এভাবে বাধা হিসেবে থেকে যায় তবে বাংলাদেশের উচিত দ্রুত বিকল্প বাজার খোঁজা। তিনি সরকারের কাছে কূটনৈতিক চাপ বাড়িয়ে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের চেষ্টা চালানোর পাশাপাশি দ্রুত ও কার্যকরভাবে বিকল্প বাজার সম্প্রসারণের আহ্বান জানিয়েছেন।

অন্যদিকে আঞ্চলিক সমন্বয় ও ট্রানজিট সুবিধা কাজে লাগানোর পরামর্শও দেয়া হচ্ছে। ভারত-বাংলাদেশ ল্যান্ডপোর্ট ইমপোর্ট-এক্সপোর্ট কমিটির সভাপতি মতিয়ার রহমান বলেন, ভারত-বাংলাদেশ-নেপাল-ভুটান (বিবিআইএন) ট্রানজিট সুবিধাকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হলে নেপাল ও ভুটানে বাংলাদেশের পণ্যের রপ্তানি বাড়ানো সম্ভব, যা বর্তমান বাণিজ্য ঘাটতি অনেকটাই কমাতে সাহায্য করবে।

বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক শামিম হোসেন জানান, বন্দরের মাধ্যমে রপ্তানি বাণিজ্যকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার এবং এর পরিধি বাড়ানোর লক্ষ্যে কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ গ্রহণ করছে। তিনি বলেন, বন্দর কার্যক্রম সচল রাখতে অবকাঠামো ও লজিস্টিক সক্ষমতা উন্নয়নে কাজ চলছে এবং ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষায় সহায়ক পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।

বর্তমান সংকট কাটিয়ে উঠতে ব্যবসায়িক ও কূটনৈতিক মিলিত উদ্যোগ, বিকল্প বাজার বিকাশ এবং আঞ্চলিক ট্রানজিট ব্যবস্থার কার্যকর ব্যবহার জরুরি—এমনটাই সংশ্লিষ্টদের মনোভাব।

পোস্টটি শেয়ার করুন