বৃহস্পতিবার, ২১শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সেবা দেওয়া করুণা নয়, সরকারের মৌলিক দায়িত্ব

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ন্যায়ভিত্তিক ও আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে স্বচ্ছ, জবাবদিহি ও জনবান্ধব ভূমি ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই। মঙ্গলবার (১৯ মে) সকালে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে ভূমি ভবনে ‘ভূমিসেবা মেলা-২০২৬’ উদ্বোধনের পরে তিনি বলেন, জনসেবা দেওয়া জনগণের প্রতি করুণা নয়—এটি সরকারের দায়িত্ব। আমাদের লক্ষ্য দুর্নীতিমুক্ত, হয়রানিমুক্ত, প্রযুক্তিনির্ভর ও নাগরিকবান্ধব ভূমি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করা, যা দেশের টেকসই উন্নয়নকে আরও ত্বরান্বিত করবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, অতীতের তুলনায় বর্তমানে ভূমির মালিকানা অনেকাংশে জটিল হয়েছে। ‘‘সময়ের সাথে সাথে যে জমির মালিক একজন ছিলেন, আজ সেই ভূমির মালিক হয়তো শত কিংবা তারও বেশি মানুষের”—এভাবে মালিকানা-বণ্টন বেড়ে যাওয়ায় জমি সম্পর্কিত রেকর্ড সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে ভূমি কর্মকর্তাদের দায়িত্বও বহুগুণ বেড়েছে।

তিনি বলেন, মালিকানা, খাজনা, দলিল, খতিয়ান, দাগ, পর্চা, নামজারি, জমা-খারিজ—এই ধরনের শব্দগুলো প্রতিটি জমি-দরদশার মানুষের কাছে পরিচিত। আগেও মানুষ এসব কাজ করাতে ভূমি অফিসে আসতেন, কিন্তু প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে ভূমি প্রশাসন ধীরে ধীরে আধুনিক হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ভূমি-জমি ব্যবস্থাপনাকে যত বেশি আধুনিক ও ডিজিটাল করা যাবে, জমি সংক্রান্ত বিরোধও তত সহজে নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে। অনলাইন সেবা নিশ্চিত করলে জনগণের দুর্ভোগ কমবে এবং ভূমি অফিসে মধ্যস্বত্তাধিকারীদের সরব উপস্থিতি, দুর্নীতি ও হয়রানিও হ্রাস পাবে। চলমান ভূমি মেলা মানুষকে আধুনিক ভূমি পরিষেবা ও তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে আরো সচেতন করবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে মাথাপিছু জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছ; জমির মূল্য বেড়েছে এবং সাথে সাথে জমি-সংক্রান্ত বিরোধ, মামলা ও জটিলতা বাড়ছে। এসব বিরোধ ব্যক্তি ও পরিবারের শান্তি নষ্ট করার পাশাপাশি জাতীয় উন্নয়নকাজেও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। তাই পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার, সঠিক রেকর্ড সংরক্ষণ ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা এখন সময়ের নিতান্ত প্রয়োজনীয়তা।

ভূমি মন্ত্রণালয় উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে জরিপ কার্যক্রম ও নির্ভুল ভূমি রেকর্ড প্রস্তুত করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে—এমনটা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভূমি সংক্রান্ত প্রায় সব সেবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনা হচ্ছে, যাতে নাগরিকরা দ্রুত ও সহজভাবে সেবা নিতে পারে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এর ফলে মানুষ আর অযথা অফিস থেকে অফিসে ঘোরাঘুরি করবে না, দুর্নীতি বা হয়রানির শিকার হবে না।

সরকার ভূমি ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নের লক্ষ্যে সারাদেশে ভূমিসেবা মেলা আয়োজন করছে এবং এই বিষয়ের গুরুত্ব তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ও পূর্ববর্তী ৩১ দফা কর্মসূচিতেও প্রতিফলিত হয়েছে—এমনটি প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সরকার প্রতিটি ক্ষেত্রে জনবান্ধব কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকতে চায়। দীর্ঘ সময়ের শাসনক্ষয় ও শোষণের পর জনগণ নিজেদের অধিকার রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে দেখতে চায়; এজন্য নির্বাচনী ইশতেহার ও অন্যান্য প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুরু থেকেই গুরুত্ব পেয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, দেশের বিভিন্ন আদালতে দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলাসহ মোট প্রায় ৪৭ লাখেরও বেশি মামলা বিচারাধীন আছে এবং এর মধ্যে জমি-সংক্রান্ত মামলার অংশ সবচেয়ে বেশি। তাই আদালতে বিচারাধীন মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি সরকারের এক বড় অগ্রাধিকার। তিনি এ বিষয়ে বললেন, কেবল প্রচলিত আদালতে নির্ভর না করে গ্রাম আদালত, বিকল্প বিবাদ নিরসন (এডিআর), সালিশ ও মধ্যস্থতার মতো আইনানুগ পদ্ধতিতে বিরোধ নিষ্পত্তি করা খুবই জরুরি। এতে বিরোধ দ্রুত মিটবে এবং অনেকক্ষেত্রে শত্রুতা ও বিরোধের টানাপোড়েনও কমে আসবে।

বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির প্রয়োজনে আলবার্ট আইনস্টাইনের কথাও স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী: ‘‘শক্তি দিয়ে শান্তি রক্ষা করা যায় না, বোঝাপড়ার মাধ্যমেই তা অর্জন করা সম্ভব।’’ তিনি বলেন, জমি-সংক্রান্ত মামলাগুলো পর্যায়ক্রমে সমঝোতা, মধ্যস্থতা ও সালিশের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হলে আদালতের জট কমবে এবং দ্রুত সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে।

প্রধানমন্ত্রী ভূমিকে কেবল একটি সম্পদ হিসেবে দেখছেন না—বলছেন, ভূমি মানুষের জীবনে নিরাপত্তা, নির্ভরতার উৎস, অর্থনৈতিক স্থিতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ভিত্তি। এই উপলব্ধি থেকেই সরকার ভূমি ব্যবস্থাপনাকে হয়রানি ও দুর্নীতিমুক্ত করার অঙ্গীকার নিয়ে সেবাগুলো জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে কাজ করছে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভূমি মন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন। ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন এবং ভূমি সচিব এ এস এম সালেহ উদ্দিন বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে সমাজ কল্যাণ, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক এ জেড এম জাহিদ হোসেন, কৃষি মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ, আইন ও বিচার মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা, প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিবসহ সংসদ সদস্য ও উচ্চ পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সারাদেশের জেলা ও উপজেলায় এ মেলার মাধ্যমে জনগণ সরাসরি উপকৃত হবে। মেলায় ই-নামজারি, অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর প্রদানের সুবিধা, রেকর্ড সংশোধন, খতিয়ান গ্রহণ এবং জমি সংক্রান্ত অভিযোগ নিষ্পত্তির মতো সেবা সরবরাহ করা হচ্ছে, যাতে মানুষ দ্রুত সুবিধা পান এবং জমি-দিচ্ছি-নেওয়ার প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও দ্রুতগতিসম্পন্ন হয়।

পোস্টটি শেয়ার করুন