বুধবার, ২৪শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১০ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অর্থনীতির সংকট গভীর, স্থিতিশীল করতে লাগবে অন্তত দুই বছর: অর্থমন্ত্রী

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি এক গভীর ঝঞ্ঝার মুখে—এই ছবি তুলে দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি পুরোপুরি স্থিতিশীল করতে নতুন সরকারের অন্তত দুই বছর সময় লাগবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সংকটের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছে। শুধু অতীতের ঋণের বোঝাই নয়; অন্তর্বর্তী প্রশাসনের কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত, বাস্তবায়নজনিত জটিলতা ও প্রশাসনিক শিথিলতাই সংকট ত্বরান্বিত করেছে। ব্যাংকিং খাতে কঠোর সংস্কার এবং শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও, প্রমাণ সাপেক্ষে না করে ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করা, ঢালাও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদি বেসরকারি বিনিয়োগে ভয় ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। ফলশ্রুতিতে অনেক বিনিয়োগ স্থবির হয়েছে, উৎপাদন বন্ধ বা কমে গিয়ে কর্মসংস্থানও প্রভাবিত হয়েছে।

ব্যাংক একীভূতকরণে তাড়াহুড়া ও দীর্ঘসূত্রতা পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে। দুর্বল ব্যাংকগুলো ঢালাওভাবে একীভূত করার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত ও পরে তা বাস্তবায়নে দেরি নীতি নির্ধারণ এবং পরিচালনা পর্ষদ পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় রাজনীতিক ও ব্যবসায়িক প্রভাবের অভিযোগ উঠে। বিশেষ করে খেলাপি ঋণ সনাক্ত ও আলাদা করতে ব্যর্থতার ফলে অনিশ্চয়তা ও নন-পারফর্মিং লোন বেড়ে গেছে।

উন্নয়ন কর্মসূচি ও প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আরেকটি বড় ব্যাধি। ইউনূস আমলের কাল্পনিক বৃদ্ধির হিসাব সংশোধনের প্রক্রিয়ায় সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের গতি কমে যায়—ফলশ্রুতিতে প্রকৃত অর্থছাড় প্রায় ১০৩ কোটি ডলার কমে যায় এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন হার বিষণ্ণভাবে নেমে আসে। পাইপলাইনে আটকে থাকা কোটি কোটি ডলারের ঋণ ও প্রকল্পগুলো দ্রুত ছেঁকে মুক্ত না হলে অর্থনীতি সচল করা কঠিন হবে।

একই সময়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেলসহ বড় মেগা প্রকল্পগুলোর ‘গ্রেস পিরিয়ড’ শেষ হওয়ায় এখন মূল ধার ও সুদ—দুটোই একসঙ্গে পরিশোধ করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিকভাবে সুদের হার বাড়ায় (বিশেষত ফ্লোটিং রেট) ঋণ পরিশোধের ব্যয় দ্রুত বাড়ছে—এভাবে ঋণ বোঝা বহু গুণ বাড়ছে।

বিদেশি সহায়তা ও ঋণের প্রবাহও সংকুচিত হয়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) জানায়, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত বিদেশি ঋণের মোট প্রতিশ্রুতি ছিল ৪২৩ কোটি ডলার; যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময় তা ছিল ৫৪৯ কোটি ডলার—অর্থাৎ প্রতিশ্রুতি প্রাপ্তিতে স্পষ্ট পতন। একই সময় মোট বিদেশি সহায়তার প্রকৃত অর্থছাড় কমে ৪৫৮ কোটি ডলারে নেমে এসেছে, যা আগের বছর ছিল ৫৬১ কোটি—প্রায় ১০০ কোটি ডলারের বেশি ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর ফলে চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের খরচ ৪০০ কোটি ডলারের ঘর অতিক্রম করেছে।

অন্য এক দিক হলো পুঁজি পাচার ও তদারকির দুর্বলতা। ২০২৫ সালে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের আমানত উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে ৮৩.৪১ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁতে দাঁড়ায়—আগের বছর যেখানে ছিল প্রায় ৫৯ মিলিয়ন ফ্রাঁ। প্রতিবেদনে বলা হয়, তৎ সময়ে কিছু অনিয়ম ও দুর্বল তদারকির সুযোগ নিয়ে পুঁজি পাচারের ঘটনা সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। যদি প্রতি ফ্রাঁ ১৫২ টাকা ধরা হয়, তবে ৮৩.৪১ মিলিয়ন ফ্রাঁ হওয়ার পরিমাণ আনুমানিক ১২,৬৭৮ মিলিয়ন টাকা, যা প্রায় ১,২৬৭.৮ কোটি টাকার সমমান।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই জটিল পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কূটনৈতিক পদক্ষেপ ও আর্থিক সহযোগী দেশ ও সংস্থার সঙ্গে আলোচনাকে জোরদার করা দরকার। পাইপলাইনে আটকে থাকা তহবিলগুলো দ্রুত মুক্তির ব্যবস্থা করতে হবে; পাশাপাশি ভবিষ্যতে যে কোনো ঋণের শর্ত, সুদের হার ও পরিশোধ সময়সীমা আরও কঠোরভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়ন সক্ষমতা বাড়িয়ে প্রতিটি ডলারের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করাই হবে সংকট মোকাবেলার প্রধান উপায়।

অর্থনীতিবিদরাও আলাদা করে বলছেন—স্বচ্ছ প্রশাসন, নীতিগত স্থিতিশীলতা ও লক্ষ্যমুখী সংস্কার ছাড়া বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে না। তাই ব্যাংক সংস্কার, দুর্নীতি ও অর্থপাচারের বিরুদ্ধে কার্যকর তদন্ত ও নিয়ন্ত্রণ, উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

সংক্ষেপে, সরকারের কাছে সময় ও পরিকল্পিত পদক্ষেপ দরকার—শুন্য থেকে শুরু করে দ্রুত সুদ ও ঋণ বোঝা সামলানো সম্ভব নয়। অর্থমন্ত্রী বলছেন, পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে অন্তত দুই বছর প্রয়োজন; বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়, তবে পুনরুদ্ধার তাড়াতাড়ি সম্ভব।

পোস্টটি শেয়ার করুন