ইউনূস আমলের কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক ত্রুটির কারণে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক অবস্থা গভীর সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টানা টানাপড়েন এবং বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা এর প্রধান কারণ। পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও কৌশলগত পদক্ষেপ দেশকে আরও জটিল পরিস্থিতিতে ঠেলে দিয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর মতে, দেশের এই গভীর অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা পুরোপুরি স্থিতিশীল অবস্থা ফিরিয়ে আনতে অন্তত দুই বছর সময় প্রয়োজন হবে।
সংকটের পেছনে মূল কারণগুলো বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নীতিগত ত্রুটিগুলোর পাশাপাশি কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জও রয়েছে। যেমন- ব্যাংকিং খাতে দূর্বলতা, এর জন্য নেওয়া অপ্রয়োজনীয় ও একপাক্ষিক সিদ্ধান্তগুলো দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও নড়বড়ে করে তুলেছে। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য নেওয়া কঠোর পদক্ষেপগুলো নানা বিতর্ক সৃষ্টি করে, যার ফলে ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ এবং ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কারণে বেসরকারি খাতে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলস্বরূপ, বিনিয়োগ কমে গেছে।
তারল্য সংকটে ব্যাংকগুলোতে আমানতকারীদের আস্থা কমে যাওয়ায় কারখানাগুলো জনবল ছোট করছে বা উৎপাদন বন্ধের পথে। এতে কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়ে।
এছাড়া, উন্নয়ন প্রকল্পের গতির অভাব ও জটিলতাগুলো প্রকৃত অর্থায়ন কমিয়ে দিয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বিদেশি ঋণ আটকে থাকলেও, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও পর্যাপ্ত সক্ষমতার অভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নের হার কমে যায়। ফলে দেশের আঞ্চলিক অর্থনীতির চাকা ধীরগতিতে চলতে থাকে।
ব্যাংকিং খাতে ভুল নীতির জন্য অস্থিতিশীলতার সৃষ্টি, দুর্বল ব্যাংকগুলোকে সম্পূরক একীভূতকরণে ধীরগতি এবং খেলাপি ঋণের বেড়ো যাতে কন্ট্রোল সম্ভব হয়নি, এমনই ক্ষত চিহ্নিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বড় বড় মেগা প্রকল্পের ‘গ্রেস পিরিয়ড’ শেষ হওয়ায় এখন মূল ও সুদসহ ঋণের পরিশোধে বোঝা আরও বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সুদের হার বৃদ্ধির কারণে ঋণের পরিশোধের খরচ বহুগুণে বেড়ে গেছে।
অন্যদিকে, অন্তর্বর্তীকালীন শাসনামলের দুর্বলতা ও দুর্নীতির অপকর্মগুলো ব্যাংক ও আর্থিক খাতে নতুন সূচনার পথে বাধা সৃষ্টি করছে। দুর্নীতির দমন ও স্বচ্ছতার অভাবের ফলে নানা পর্যায়ে তদবির ও স্বজনপ্রীতি বেড়েছে। উন্নয়নের নামে দুর্নীতি ও অসাধু কার্যক্রমের জন্য অনেক প্রকল্পের কাজ স্থগিত হয়ে গেছে বা অপ্রয়োজনীয়ভাবে দরপত্র ছাড়াই কিছু প্রতিষ্ঠান কাজ পেয়ে যায়, যা দেশের অর্থনীতির স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
অপরদিকে, সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত একেবারে নতুন উচ্চতায় পৌঁছিয়েছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশিদের সুইস ব্যাংকে জমা অর্থের পরিমাণ প্রায় ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঁ—যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪১ শতাংশ বেশি। এই অর্থের মোট মূল্য আনুমানিক ১২ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকার বেশি। এর পাশাপাশি, বিদায়ী বছরে বিদেশি ঋণের প্রবাহ কমে যাচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য এক ধরনের চ্যালেঞ্জ। চলতি বছরে প্রথম ১১ মাসে দেশের ঋণের পরিমাণ সাড়ে ৪০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশি সহায়তা কমে যাওয়ায় ও ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক সুদের হার বৃদ্ধির কারণে ঋণ শোধের ভাড়া বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে, দেশের অর্থনীতির চাকা জোড়াতালি দিয়ে চলতে থাকলেও সংকটময় পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। এ জন্য, বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় জটিলতা দূর করে অর্থপ্রাপ্তি দ্রুততর করতে হবে। ভবিষ্যতে নতুন ঋণের শর্তগুলো অতি কঠোরভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। সর্বোপরি, প্রয়োজন দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানো, প্রকল্পের কাজে বেশি মনোযোগ দেওয়া এবং ডলারের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে এই সংকট থেকে উত্তরণের মূল চাবিকাঠি।